মহাকাশের পরিবেশ মানুষের মস্তিষ্কের কোষ ও জিনগত গঠনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা জানতে নতুন এক গবেষণা শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। এ গবেষণার অংশ হিসেবে গবেষণাগারে তৈরি মানব মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র ত্রিমাত্রিক মডেল পাঠানো হয়েছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস)। মস্তিষ্কের নিউরাল টিস্যু দিয়ে তৈরি এসব মডেল মহাকাশের অতি কম মাধ্যাকর্ষণ ও বিকিরণের প্রভাব বুঝতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাসা ও স্পেসএক্সের যৌথ কার্গো মিশন ‘সিআরএস-৩৫’-এর মাধ্যমে এসব মডেল মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে যাত্রা শুরু করা মিশনটির ড্রাগন ক্যাপসুলে ছিল ২ হাজার ৮৬০ কেজি রসদ ও গবেষণার সরঞ্জাম। এর মধ্যে রয়েছে ‘মিব্রেনস’ নামে পরিচিত ক্ষুদ্র মানব মস্তিষ্কের মডেল।
মডেলগুলো প্রায় পাঁচ সপ্তাহ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে রাখা হবে। এ সময়ে মহাকাশে থাকা মডেলগুলোর সঙ্গে পৃথিবীতে একই পরিবেশে সংরক্ষিত অনুরূপ মডেলের তুলনা করবেন গবেষকেরা। এর মাধ্যমে মহাকাশের পরিবেশে মস্তিষ্কের কোষে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা বোঝার চেষ্টা করা হবে।
মহাকাশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে মানবদেহে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। অতি কম মাধ্যাকর্ষণ ও মহাজাগতিক বিকিরণ মস্তিষ্কের কোষের কার্যক্রম এবং জিনের প্রকাশে কী প্রভাব ফেলে, তা এই গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।
বিজ্ঞানীরা দেখতে চান, মহাকাশের পরিবেশে মস্তিষ্কের টিস্যুতে এমন কোনো পরিবর্তন ঘটে কি না, যা বার্ধক্য প্রক্রিয়া কিংবা বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব পরিবর্তনের ধরন ও মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলে মহাকাশযাত্রার সময় নভোচারীদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন সহজ হতে পারে।
চাঁদ, মঙ্গল কিংবা আরও দূরের গন্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নভোচারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার কারণে পেশির ক্ষয়, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দেহের তরল পদার্থের বণ্টনেও পরিবর্তন ঘটে, যার কারণে নভোচারীদের মুখমণ্ডল কিছুটা ফোলা দেখাতে পারে।
গবেষণাগারে তৈরি ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের মডেল নিয়ে এ গবেষণা মহাকাশের পরিবেশে স্নায়ুতন্ত্রের সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে। ভবিষ্যতে এসব ফলাফল নভোচারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
‘সিআরএস-৩৫’ মিশনে মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি উদ্ভিদের রোগবালাই সম্পর্কেও পরীক্ষা চালানো হবে। মহাকাশের অতি কম মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে উদ্ভিদের রোগ কীভাবে ছড়ায় এবং উদ্ভিদের ওপর এর কী প্রভাব পড়ে, তা জানার চেষ্টা করবেন বিজ্ঞানীরা।
দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে মহাকাশেই ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। মহাকাশে উৎপাদিত উদ্ভিদ খাদ্য ও পুষ্টির জোগান দেওয়ার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ও অক্সিজেন উৎপাদনেও ভূমিকা রাখতে পারে।
মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র মডেল ও উদ্ভিদ নিয়ে এসব গবেষণা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতি এবং নভোচারীদের জীবনযাপনের পরিবেশ উন্নত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: নাসার প্রতিবেদন, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর সর্বশেষ খবর