শরতের নীল আকাশ, সবুজে ভরা প্রাকৃতি, সারিবাঁধা পাহাড়, মেঘ ও কুয়াশার লুকোচুরি, প্রমত্তা মাতামুহুরী নদীর সৌন্দর্য। সবমিলে অরণ্য কন্যা লামার অপার দান "মিরিঞ্জা পর্যটন ভ্যালী"। পাহাড়, নদী, ঝর্ণা আর বনবনানীতে সৌন্দর্যে ভরা এই অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট সারাদেশের ভ্রমণপিয়াসি মানুষ। এবার শারদীয় দুর্গাপূজা উৎসব ও প্রবারণা পূর্ণিমা ঘিরে লম্বা ছুঁটিতে লামার পর্যটন স্পটগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষণীয়।
বছর জুড়েই পর্যটকদের ভিড় থাকে লামায়। ঈদ-পূজাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ছুটিতে ভ্রমণপিয়াসি মানুষের ঢল নামে লামার মিরিঞ্জা ও সুখিয়া ভ্যালীতে। এসময় হোটেল-মোটেলে সিট-রুম সংকট দেখা দেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
এবার পর্যটক নিরাপত্তায় লামা উপজেলা প্রশাসন, লামা থানা ও সেনাবাহিনী বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় দর্শনীয় স্থানসমূহে একাধিক মেডিক্যাল টিম, ফায়ার সার্ভিস, তথ্য কেন্দ্র, পুলিশের একাধিক টিম চোখে পড়ার মতো।
মিরিঞ্জা ভ্যালির অবস্থান
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা বান্দরবানের অন্তর্গত লামা উপজেলা। অপরদিকে কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে আলীকদম সড়কে লামার অবস্থান। এই উপজেলারই অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর মিরিঞ্জা ভ্যালি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ভ্যালির অবস্থান প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট উঁচুতে।
মিরিঞ্জা ভ্যালির ইতিহাস ও বিশেষত্ব
সরাসরি ভ্যালির ইতিহাস বা এর নামকরণের উৎপত্তি নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মিরিঞ্জা পর্যটন কমপ্লেক্সের গোড়াপত্তন হয়েছিল ২০১০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রায় ৩৩ একর পাহাড়ি ভূমিকে ঘিরে। এর আগেও কিছু ট্রেকারদের আনাগোনা থাকলেও এই কমপ্লেক্সই মূলত স্থানটির জনপ্রিয়তা সৃষ্টি করে। মিরিঞ্জা পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্তের চূড়ায় ইট পাথরে নির্মাণ করা হয় বিখ্যাত টাইটানিক জাহাজের ভাস্কর্য, যার উদ্বোধন হয় ২০১১ সালের ১৯ এপ্রিল।
এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো পাহাড় ও মেঘের অসাধারণ মিথস্ক্রিয়া। এই কারণে পর্যটনকেন্দ্রটিকে বর্তমানে দ্বিতীয় সাজেক ভ্যালি হিসেবে অভিহিত করা হয়।
ঢাকা থেকে মিরিঞ্জা ভ্যালি যাওয়ার উপায়
মিরিঞ্জা যাওয়ার জন্য প্রথমত রাজধানী ঢাকার রাজারবাগ, ফকিরাপুল বা সায়েদাবাদ থেকে কক্সবাজারের বাস ধরতে হবে। তারপর গন্তব্যের আগেই নেমে যেতে হবে চকরিয়া বা চিরিঙ্গা বাস টার্মিনালে। এছাড়া কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রেলপথে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যাওয়া যায়। তারপর বাসে করে সরাসরি চকরিয়া বাস টার্মিনাল।
দ্রুত সময়ে যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারের ফ্লাইট ব্যবহার করা যেতে পারে। তারপর কক্সবাজার থেকে বাসে করে চকরিয়া পৌঁছাতে ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট সময় লাগে।
চকরিয়া থেকে লামা-আলীকদম সড়ক ধরে মিরিঞ্জা ভ্যালিতে যাওয়ার সিএনজি, জিপগাড়ি বা লোকাল বাস পাওয়া যায়। এই পরিবহনগুলো লামা-আলীকদম পথে মিরিঞ্জা পাহাড়ের পাশে নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে ১০ মিনিট হাঁটার দূরত্বে ভ্যালির অবস্থান।
যারা ট্রেকিং করতে ইচ্ছুক তাদের চকরিয়া থেকে চান্দের গাড়িতে করে মুরুম পাড়া পর্যন্ত আসতে হবে। এখান থেকে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে ভ্যালি পর্যন্ত ২০ মিনিটের একটি সহজ ট্রেকিং পথ আছে। চান্দের গাড়িগুলো মিরিঞ্জা পাড়া পর্যন্তও যায়, যেখানে মেইন রোড থেকে ভ্যালি মাত্র ১০ মিনিট হাঁটা পথ।
মিরিঞ্জা ভ্যালি ভ্রমণে কী কী দেখবেন
পাহাড়ি রাস্তা বা ঝিরিপথ পেরিয়ে চূড়ায় আরহণের পর দূরে দেখা যায় মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স এবং মাতামুহুরী নদীসহ বিশাল পাহাড়জুড়ে বিস্তীর্ণ সবুজ বনভূমি। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্য এই চূড়া উপযুক্ত একটি স্থান। এখান থেকে দিগন্তরেখায় কক্সবাজার অংশের বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি চোখে পড়ে। সেই সঙ্গে দৃশ্যমান হয় লাইট হাউস,যার ক্ষীণ আলোয় সরু রেখায় আলোকিত হয়ে ওঠে পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকত।
মুগ্ধতার পরিসর আরও একটু বাড়িয়ে দিয়ে কখনো কখনো সেই রেখায় ভেসে ওঠে একটি দুটি জাহাজ। পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্তের টাইটানিক জাহাজের কাঠামোটিও এখানকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পর্যটনকেন্দ্রের কাছেই উপজেলা শহরে ম্রো, ত্রিপুরা, ও মারমাসহ মোট ১১ জনগোষ্ঠির বসবাস।
মিরিঞ্জা ভ্যালি ভ্রমণে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা
পাহাড়ের উপরের বাঁশ ও খড়ের মাচাং এবং জুম ঘরগুলো যথেষ্ট পরিবেশবান্ধব। এগুলো যাত্রাবিরতিতে বসবাসের জন্য উপযোগী। এ ছাড়া পর্যটন কমপ্লেক্সের ভেতর খোলা আকাশের নিচে রয়েছে বেশ কয়েকটি তাবু ঘর। তাই রাতে ক্যাম্পিং নিয়ে ঝামেলা নেই। এছাড়া পরিবার নিয়ে থাকতে চাইলে এসি ও নন এসি পট হাউজ ও কটেজ রয়েছে।
এই ছোট বাসস্থানগুলোকে ঘিরে আশপাশে রয়েছে চিকেন ফ্রাই ও বিরিয়ানিসহ নানা পদের খাবারের ব্যবস্থা। তবে কমপ্লেক্স বা রিসোর্টের বাইরে থাকার এবং খাবারের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। সুতরাং, ট্রেকিং বা আশপাশ ঘুরে দেখার সময় শুকনো খাবার বা পানীয় সঙ্গে রাখা উচিত।
বান্দরবানের মিরিঞ্জা ভ্যালির মেঘ ও পাহাড়ের নিবিড় আলিঙ্গন ভ্রমণপিপাসুদের বারবার মনে করিয়ে দেয় সাজেকের কথা। এখানকার জুমঘরগুলোর যে কোনোটিতে একটি রাত কাটানো সারা জীবনের জন্য অবিস্মরণীয় এক স্মৃতি হয়ে থাকবে। সবুজ বনে আচ্ছাদিত সুবিশাল পাহাড় আর সীমান্তরেখায় সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি ট্রেকিংয়ের ক্লান্তিকে নিমেষে ভুলিয়ে দেয়। এই অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য বড় দল নিয়ে ভ্রমণ করা আবশ্যক। সেই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের যোগাযোগের নাম্বার সংগ্রহে রাখা জরুরি।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর