জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সকালে হাসিমুখে ঘর থেকে বের হওয়া ১৭ বছরের তরুণ রোমান হোসেন আর কোনো দিন মায়ের সান্নিধ্যে ফিরবেন না।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে টঙ্গী-ঘোড়াশাল-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে এক আকস্মিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় থমকে গেছে একটি তাজা প্রাণের সব স্বপ্ন। ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চিরদিনের মতো না ফেরার দেশে চলে গেছেন এই ডেলিভারি বয়।
নিহত মো. রোমান হোসেন গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ পৌরসভার মুনশেফপুর গ্রামের মো. বিল্লাল হোসেনের ছেলে। দুই ভাইয়ের মধ্যে রোমান ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান। অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতা আনতে এবং বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে স্থানীয় একটি কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে ডেলিভারি বয় হিসেবে চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। ১৭ বছরের তরুণ বয়সে যেখানে বই-খাতা হাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার কথা, সেখানে পরিবারের চাকা সচল রাখতে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন জীবিকার ভারী দায়িত্ব।
নিহতের মামার দেওয়া তথ্যানুযায়ী জানা গেছে, ঘটনার দিন প্রতিদিনের মতো নিয়মমাফিক ডেলিভারির উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন রোমান। কে জানত, এই বের হওয়াই হবে তাঁর জীবনের শেষ প্রস্থান। টঙ্গী-ঘোড়াশাল-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের তুমুলিয়ার কামারবাড়ি এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ করেই সামনে এসে পড়ে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। আকস্মিক বিপদের মুখোমুখি হয়ে অটোরিকশার যাত্রীদের বাঁচানোর তাগিদে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের মোটরসাইকেলটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করেন রোমান। কিন্তু মুহূর্তের এক মুহূর্তের অসামঞ্জস্যতায় দ্রুতগতির মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের একটি দোকানের ভেতরে সজোরে গিয়ে ঢুকে পড়ে।
দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই মারাত্মক ছিল যে, ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তরুণ রোমান। তাঁর এই আকস্মিক বিদায় মেনে নিতে পারছেন না কেউ-ই। খবরটি যখন তাঁর মুনশেফপুরের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে মা-বাবার হৃদয়বিদারক আর্তনাদে। যে ঘরে বড় ছেলের হাসিমুখ দেখার অপেক্ষায় থাকেন বাবা-মা, সে ঘরে এখন কেবল শোকের মাতম। বড় ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা বিল্লাল হোসেন। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ।
পরিবারের অভাবের তাড়নায় অল্প বয়সে জীবনযুদ্ধে নামা রোমানের এমন মর্মান্তিক পরিণতি এলাকাবাসী কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। পাড়া-প্রতিবেশী ও স্বজনদের চোখে ভেসে উঠছে হাসিখুশি সেই তরুণের অবয়ব, যিনি কুরিয়ার সার্ভিসের বাইক নিয়ে এ বাড়ি-ও বাড়ি ছুটে বেড়াতেন মানুষের পার্সেল পৌঁছে দিতে। কিন্তু আজ নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে নিজেই এক মুঠো স্মৃতির ঠিকানায় পরিণত হলেন তিনি।
সড়ক দুর্ঘটনা যেন আজ প্রাত্যহিক এক মারণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচলের বলি হতে হচ্ছে রোমানের মতো কত তাজা প্রাণকে। একটু সচেতনতা হয়তো বাঁচাতে পারত সম্ভাবনাময় এই তরুণের জীবন। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং চালকদের সাবধানতা ছাড়া এমন অকালমৃত্যুর মিছিল হয়তো থামবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর