একটি নলকূপ বসানোর জন্য মাটি খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে আসছিল গ্যাস। মুহূর্তেই সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এরপর এক দিন, দুই দিন, তিন দিন পেরিয়ে গেলেও নেভেনি আগুন। বরং সময়ের সঙ্গে বেড়েছে তার তীব্রতা। ঘটনাটি প্রথমে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করলেও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভিন্ন এক সম্ভাবনা। ফলে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে ভূগর্ভে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে ধারনা করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) প্রতিনিধিদল গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সেখানে উচ্চমাত্রার হাইড্রোকার্বনের আলামতও পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এ কারণে যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে অগভীর স্তরে পাওয়া বায়োজেনিক গ্যাসের সঙ্গে ইনানীর গ্যাসের বৈশিষ্ট্যের মিল নেই। সাধারণত অগভীর ভূস্তরে পাওয়া বায়োজেনিক গ্যাসের সঙ্গে পানি উঠে আসে। কিন্তু ইনানীতে নির্গত গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন বাপেক্সের কর্মকর্তারা। সাধারণত ভূগর্ভস্থ গ্যাসক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট পাওয়া যায়। এটি গ্যাসের সঙ্গে থাকা তরল হাইড্রোকার্বন।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তাই ইনানীতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তবে এটিকে এখনই গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করতে রাজি নন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গ্যাসের রাসায়নিক গঠন, প্রকৃতি ও ভূগর্ভস্থ অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এসএম নাফিকুন আরহাম দেশ গণমাধ্যমে বলেন, ‘এখানে উচ্চমাত্রার হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি রয়েছে। ভোলার শাহবাজপুরে অগভীর স্তরে গ্যাস পাওয়ার নজির থাকলেও সেখানকার গ্যাসের সঙ্গে ইনানীর গ্যাসের পার্থক্য রয়েছে। শাহবাজপুরের গ্যাস বায়োজেনিক। ওই গ্যাসের সঙ্গে পানি ওঠে। কিন্তু কক্সবাজারের এই গ্যাস বায়োজেনিক নয়। এই গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট উঠছে। আমাদের পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে, এখানে গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।’
ইনানীর ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গ্যাসের প্রকৃতি। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, সাধারণত ভূগর্ভে গ্যাস তৈরির প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে একে প্রধানত বায়োজেনিক ও থার্মোজেনিক দুই ভাগে বিবেচনা করা হয়। বায়োজেনিক গ্যাস তৈরি হয় অণুজীবের মাধ্যমে জৈব পদার্থ ভেঙে যাওয়ার প্রক্রিয়ায়। সাধারণত ভূগর্ভের অগভীর স্তরে এ ধরনের গ্যাসের ছোট ছোট মজুত বা পকেট থাকতে পারে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় নলকূপ খনন করতে গিয়ে এ ধরনের গ্যাস বের হওয়ার নজির রয়েছে।
ভোলার শাহবাজপুর এলাকায় কয়েক দশক আগে অগভীর স্তরে এমন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে নিজেদের উদ্যোগে পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব গ্যাস ব্যবহার করছেন। তবে এসব গ্যাসের প্রবাহ ও তীব্রতা অনেক ক্ষেত্রে এক মাস বা তার কিছুদিন পর কমে আসে।
অন্যদিকে থার্মোজেনিক গ্যাস তৈরি হয় ভূগর্ভে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের প্রভাবে জৈব পদার্থের রূপান্তরের মাধ্যমে। গভীর ভূস্তরের গ্যাসক্ষেত্রে এ ধরনের গ্যাসের উপস্থিতি বেশি পরিচিত। গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের উপস্থিতিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য।
পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক মুকবুল ই ইলাহী গণমাধ্যমে বলেন, 'স্বল্পগভীরতায় গ্যাস পাওয়া যাবে না, বিষয়টি এমন নয়। ভোলার শাহবাজপুরে এ ধরনের গ্যাস পাওয়া যায়। গত ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে সেখানকার সাধারণ মানুষ নিজেদের উদ্যোগে গ্যাস ব্যবহার করছেন। পরে শাহবাজপুর ও ভোলার ইলশায় বাপেক্স গ্যাসের খনিও আবিষ্কার করেছে। তবে ইনানীর গ্যাসের প্রকৃতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পরীক্ষার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।'
বাপেক্সের কর্মকর্তারা জানান, দেশে সাধারণত ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ মিটার গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন করা হয়। কিন্তু ইনানীতে প্রায় ৮০০ ফুট গভীরতায় নলকূপ খননের সময় গ্যাস বেরিয়ে এসেছে।
বাপেক্সের অনুসন্ধান বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জেবুন নাহার বলেন, 'সাধারণত মাটির অগভীর স্তরে বায়োজেনিক গ্যাসের ছোট ছোট পকেট থাকে। বাপেক্স সাধারণত ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ মিটার গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস উত্তোলন করে। কিন্তু ইনানীতে প্রায় ৮০০ ফুট গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস বের হচ্ছে। ওই এলাকায় জোনভিত্তিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ হলেও গভীর অনুসন্ধান হয়নি।'
বাপেক্সের কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রায় ১ হাজার ফুট গভীরে নলকূপ খননের সময় গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর উচ্চচাপের গ্যাস ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে ভূ-পৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। পরে কোনো উৎস থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে এসে আগুন ধরে যায়। তবে গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় জোর করে এর প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করলে অন্য কোনো ফাটল দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে নতুন বিপদের সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে আপাতত আগুন নেভানোর চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
নাফিকুন আরহাম বলেন, 'গ্যাসের চাপ ও নির্গমনের মাত্রা বিশ্লেষণ না করে আগুন কত দিন জ্বলবে, তা বলা সম্ভব নয়। গ্যাসের নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করতে হবে। তবে গ্যাসের তীব্রতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় এখনো নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।'
কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোট সেতুসংলগ্ন এলাকায় গত ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। স্থানীয় আবদুল্লাহর বাড়িতে নলকূপ বসানোর জন্য খনন করা গর্ত থেকে প্রথমে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নলকূপ খননের স্থান থেকে অবিরাম আগুন জ্বলছে। গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকায়। আগুনের উৎসস্থল ঘিরে ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের নিরাপত্তাবলয় তৈরির কাজ চলছে। চারপাশে লাল পতাকা টাঙানোর পাশাপাশি কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের একাধিক দল অবস্থান করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে বাতাসের গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে আগুনের শিখা আশপাশের দিকে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামশুল আলম বলেন, 'তিন দিন ধরে আগুন জ্বলছে। নেভার পরিবর্তে এর তীব্রতা বাড়ছে। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা বাতাসে আগুন দক্ষিণ দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ওই দিকে জনবসতি বেশি থাকায় স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।'
তিনি আরও বলেন, আগুনের উৎসস্থল থেকে মাঝেমধ্যে বিস্ফোরণের মতো শব্দ হচ্ছে। আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় মাটিও সরে যাচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য বলেন, 'টানা আগুন জ্বলার কারণে এলাকায় ভূমিধস ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ কারণে বাপেক্সের পরামর্শ অনুযায়ী ২০০ মিটার এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে সীমানা নির্মাণ করছে প্রশাসন।'
তিনি বলেন, 'গত তিন দিন ধরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি দল ঘটনাস্থলে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত বাপেক্সের প্রতিনিধিদলও কক্সবাজারে অবস্থান করবে।'
বাপেক্সের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। সম্ভাব্য বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের আশঙ্কায় গ্যাস নির্গমনের স্থান থেকে ২০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, 'ঘটনাস্থলের চারপাশে ২০০ মিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরাওয়ের কাজ চলছে। নিরাপত্তার স্বার্থে এলজিআইডির সড়কটি আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিকল্প পথে চলাচলের জন্য জনগণকে বলা হয়েছে।'
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, 'উখিয়ার ছোট ইনানীর ছোট খাল এলাকায় নলকূপ থেকে গ্যাস উদ্গিরণের স্থান ও আশপাশে যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও আগন্তুকদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছে, ঘটনার পরপরই ঢাকা থেকে বাপেক্সের একটি প্রতিনিধিদল কক্সবাজারে আসে। দলটি মঙ্গলবার রাতে এবং বুধবার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ সময় চারপাশ থেকে মাটি, বালু ও পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তবে নুড়ি পাথরসহ আরও কিছু নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সংগৃহীত আলামত পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে গ্যাসের তীব্রতা ও চাপ বেশি থাকায় সরাসরি গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর