ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় না রাশিয়া। তবে ইউরোপীয় দেশগুলো যদি যুদ্ধের পথে এগোয়, তাহলে মস্কোও তার মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে কোনো পক্ষই বিজয়ী হবে না।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দেওয়া বক্তব্যে পুতিন ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়, যার পরিণতি উভয় পক্ষের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ।
পুতিনের ভাষ্য, রাশিয়া ইউরোপের সঙ্গে সংঘাত চায় না। তবে ইউরোপীয় দেশগুলো যদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয় কিংবা রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে মস্কোও পাল্টা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে।
রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার কৌশলগত পরাজয় নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নিয়েছিল, তা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি কামনা করলেও রাশিয়ার নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না—তাঁর বক্তব্যে এমন বার্তাই উঠে এসেছে।
এর আগেও একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছিলেন পুতিন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি বলেছিলেন, রাশিয়া ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধের পরিকল্পনা করছে না। তবে ইউরোপ যদি যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে রাশিয়া তার মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এবং নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন পুতিন। তাঁর দাবি, ইউরোপীয় নেতারাই এই আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
ফোনালাপকে সম্পর্ক উন্নয়নের পথে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন রুশ প্রেসিডেন্ট। তবে ইউরোপের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা হলেও রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা এবং সামরিক অবস্থান নিয়ে বিরোধ এখনো রয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই মস্কো ও পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক সহায়তা, ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলে প্রতিরক্ষা জোরদার এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, রাশিয়া ভবিষ্যতে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া যাচাই করতে ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে সীমিত সামরিক অভিযান চালাতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও বিভিন্ন পশ্চিমা মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা মূল্যায়নে বাল্টিক অঞ্চলের কোনো দেশে সীমিত স্থল অভিযান অথবা পূর্ব ইউরোপে সাইবার হামলার মতো সম্ভাব্য পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব সম্ভাবনার উদ্দেশ্য হতে পারে ন্যাটোর ঐক্য ও প্রতিক্রিয়া যাচাই করা।
তবে গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে আসা সম্ভাব্য পরিস্থিতি কোনো নিশ্চিত সামরিক পরিকল্পনার প্রমাণ নয়। রাশিয়া ইউরোপে এমন হামলার পরিকল্পনা করছে—এমন দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ইউরোপের কয়েকটি দেশে ড্রোনের উপস্থিতি, সাইবার হামলা এবং অন্যান্য সম্ভাব্য ‘হাইব্রিড’ তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও প্রতিটি ঘটনার দায় ও প্রকৃতি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো জড়িয়ে পড়লে সংঘাতের পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ উদ্বেগের কারণ।
পুতিনের বক্তব্যে একদিকে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আগ্রহ, অন্যদিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার ঘোষণা—দুটি বার্তাই স্পষ্ট। তবে উত্তেজনা কমাতে দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর