বিশ্ব ইতোমধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে প্রবেশ করেছে বলে মনে করেন বিশ্বখ্যাত ভূরাজনৈতিক কৌশলবিদ ও লেখক পরাগ খান্না। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সামরিক সংঘাত, অস্ত্র সরবরাহ এবং জ্বালানি ও পণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র তুলে ধরে তিনি এ মন্তব্য করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খান্না বলেন, ‘আমার সত্যিই মনে হয়, আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে রয়েছি।’ তবে চলমান সংঘাতগুলোকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করা তার নিজস্ব বিশ্লেষণ; এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়।
খান্নার মতে, বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। এসব সংঘাতের সঙ্গে শুধু সামরিক অভিযানই নয়, তেল, গ্যাস, সোনা ও অন্যান্য পণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। সেনা মোতায়েন, অস্ত্র সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবাহের আন্তসংযোগ বিশ্লেষণ করলে বিভিন্ন সংঘাতের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তার উদাহরণ হিসেবে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে উত্তর কোরীয় সেনাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন খান্না।
২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর ন্যাটো জানায়, উত্তর কোরীয় সেনাদের রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে এবং তাদের সামরিক ইউনিট রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য সরকারও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক অভিযানে উত্তর কোরীয় সেনাদের অংশগ্রহণের কথা জানায়।
খান্নার বিশ্লেষণে, এ ধরনের সামরিক সহযোগিতা দেখায় যে একটি অঞ্চলের যুদ্ধ কীভাবে অন্য দেশের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
সাক্ষাৎকারে উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন খান্না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে অতীতের আঞ্চলিক সংকটগুলোর তুলনা করে তিনি বলেন, লেবাননের গৃহযুদ্ধ ও আরব বসন্তের মতো ঘটনাগুলো একসময় ইউএইর উত্থানের সুযোগ তৈরি করেছিল। তবে এবার দেশটি সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভিন্ন।
ইউএইর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের ৩ মার্চ এক বিবৃতিতে জানায়, দেশটি এক হাজারের বেশি ইরানি হামলার মুখে পড়েছে। এসব হামলা প্রতিহত ও নিষ্ক্রিয় করার কথাও জানায় দেশটির সশস্ত্র বাহিনী।
একই বিবৃতিতে ইউএই জানায়, তারা এই যুদ্ধে কোনো পক্ষ নয়। ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য নিজেদের ভূখণ্ড, জলসীমা কিংবা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতিও দেয়নি দেশটি।
ভবিষ্যতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন খান্না। তবে এর অর্থ অঞ্চলটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ সরে যাওয়া নয়। বরং সাইবার সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশটি ওই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন খান্না। তার মতে, জ্বালানি বাণিজ্যে মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন খান্না। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, ইসরায়েল, ইরান, তুরস্ক, মিসর এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে এ ফোরাম গঠন করা যেতে পারে। সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে তিনি আবুধাবির নাম উল্লেখ করেছেন।
এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের আঞ্চলিক ফোরামকে উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ১৯৯৩ সালে এ ফোরাম গঠনের বিষয়ে সম্মতি হয় এবং ১৯৯৪ সালে এর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা তৈরি এবং সংঘাত প্রতিরোধে কূটনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের অন্যতম লক্ষ্য।
খান্নার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সংলাপ ও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পারস্পরিক আস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অংশগ্রহণের ওপর।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর