মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা নলবনিয়ায় রাত নামলেই আতঙ্ক বাড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের। কখন কার বাড়ির দরজায় সশস্ত্র লোক এসে দাঁড়ায়, সেই ভয় তাড়া করে তাদের। এই আতঙ্কের মূলে রয়েছে দেড় লাখ ইয়াবার একটি চালান। মিয়ানমার থেকে চালানটি কারা এনেছিল, কারা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছিল এবং মাঝপথে কারা সেটি লুট করে আত্মসাৎ করেছে, তা নিয়ে দুটি পক্ষের বিরোধ এখন প্রকাশ্য সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এই জনপদে এক পক্ষের বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচার, অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে সেই চালান লুটের অভিযোগ উঠেছে। বিরোধের জেরে চলছে অস্ত্রের মহড়া। এর বাইরে গুলিবর্ষণ, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে অস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও। স্থানীয়দের আশঙ্কা, মাদক কারবারিদের এই বিরোধে যেকোনো সময় বড় ধরনের সহিংসতা ঘটতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান নিয়ে আসা একটি চক্রের সঙ্গে নলবনিয়ার ছৈয়দুল বশর ও আরিফ প্রকাশ আব্বুইয়্যার নেতৃত্বাধীন একটি চক্রের বিরোধ চলছে। গত ২৪ অক্টোবর দেড় লাখ ইয়াবার চালান লুটের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুই পক্ষের এই বিরোধে সাধারণ মানুষ এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, গত ২৪ অক্টোবর সকালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত আমিনের নেতৃত্বে মিয়ানমার থেকে দেড় লাখ ইয়াবার একটি চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করে। চালানটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নলবনিয়ার পাঁচজনের একটি সিন্ডিকেটকে। তবে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই চালানটির গতিপথ বদলে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হস্তান্তর না করে মাঝপথে কৌশলে পুরো চালানটি সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে সেটি আত্মসাৎ করা হয়। এ ঘটনায় ছৈয়দুল বশর ও আরিফ প্রকাশ আব্বুইয়্যার নেতৃত্বাধীন চক্রের সদস্যরা জড়িত রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, চালান লুটের পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এক পক্ষের অভিযোগ, তাদের আনা ইয়াবা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অন্যদিকে চালান লুটের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বড় একটি মাদকের চালান লুটের ঘটনা ঘিরে বিরোধের বিষয়টি প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা প্রকাশ্য রূপ নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের লোকজনকে অস্ত্র প্রদর্শন করতে দেখা গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
তাদের ভাষ্য, এসব অস্ত্রের মহড়া শুধু দুই পক্ষের বিরোধের প্রকাশ নয়, পুরো এলাকার নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
তবে দেড় লাখ ইয়াবার চালানটি কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করল, কারা তা পরিবহন করছিল এবং মাঝপথে কীভাবে পুরো চালান লুট হলো, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
স্থানীয় সূত্র বলছে, ইয়াবার চালান লুটের বিরোধকে কেন্দ্র করে নলবনিয়ায় অস্ত্রের মহড়ার পাশাপাশি আরও কয়েকটি সহিংস ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর গভীর রাতে পালংখালী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি মোহাম্মদ আমিনকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একদল সশস্ত্র ব্যক্তি গভীর রাতে আমিনের বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে তাকে জিম্মি করে নিয়ে যায়। পরে রাতভর দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এতে তার একটি পা মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই ঘটনার সঙ্গেও ইয়াবার চালান লুটের অভিযোগে অভিযুক্ত চক্রের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর পালংখালী উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে সাবেক ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো ওই হামলার সঙ্গে ইয়াবার চালান লুটের ঘটনায় অভিযুক্ত চক্রের সদস্যরা জড়িত ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পালংখালী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নলবনিয়া মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন এলাকা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের বিভিন্ন পথ মাদক পাচারে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার চালান প্রবেশের পর তা পরিবহন, সংরক্ষণ ও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিতে একাধিক চক্র কাজ করে। এসব চক্রের মধ্যে চালান নিয়ে আসা, পরিবহনের দায়িত্ব পালন এবং অর্থের ভাগ-বাঁটোয়ারাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় বিরোধ তৈরি হয়। নলবনিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই বিরোধের সহিংস রূপ দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, মাদক কারবারিদের একটি পক্ষের সঙ্গে অন্য পক্ষের বিরোধ তৈরি হলে তা মেটানোর চেষ্টা হয় অস্ত্রের মাধ্যমে। কখনো চালান লুট, কখনো প্রতিশোধমূলক হামলা, আবার কখনো প্রতিপক্ষকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, রাতের বেলায় অপরিচিত লোকজনের চলাচল ও সশস্ত্র ব্যক্তিদের উপস্থিতি তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। মাদক কারবারিদের বিরোধে সাধারণ মানুষও অনিরাপদ হয়ে পড়েছেন। কে কোন পক্ষের লোক, কার সঙ্গে কার বিরোধ, এসব বিবেচনায় অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন।
এ পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল নিশ্চিত করা এবং মাদক ও অস্ত্রের অবৈধ কারবারে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
নলবনিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে দেড় লাখ ইয়াবার চালানটির উৎস ও গতিপথ। কারা মিয়ানমার থেকে চালানটি বাংলাদেশে এনেছিল, কারা পরিবহনের দায়িত্বে ছিল এবং কারা মাঝপথে সেটি আত্মসাৎ করেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের মতে, শুধু চালান লুটের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে হবে না। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা নিয়ে আসা চক্রের সদস্যদেরও শনাক্ত করতে হবে। চালানটির উৎস, সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের পথ, পরিবহনব্যবস্থা, নির্ধারিত গন্তব্য এবং আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও, যুবদল নেতা মোহাম্মদ আমিনকে তুলে নিয়ে নির্যাতন এবং সাবেক ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি করেছেন তারা।
অভিযুক্ত ছৈয়দুল বশর ও আরিফ প্রকাশ আব্বুইয়্যাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে তাদের পাওয়া যায়নি।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাদক প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর