সকাল তখন পৌনে ৮টা। কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাটে পর্যটকদের ব্যস্ততা। কারও হাতে লাগেজ, কারও সঙ্গে পরিবারের সদস্য, আবার কেউ বন্ধুদের নিয়ে অপেক্ষা করছেন বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত সমুদ্রযাত্রার জন্য। একসময় অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ৮৩০ জন পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এমভি বার আউলিয়া। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা, নানা জটিলতা ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে শুরু হলো চলতি মৌসুমে কক্সবাজার থেকে প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল পৌনে ৮টার দিকে জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। এর মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ দিন আগে পর্যটকদের জন্য দ্বীপটি উন্মুক্ত ঘোষণা করা হলেও জাহাজ চলাচল শুরু না হওয়ার যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তার অবসান হলো।
তবে জাহাজ চলাচলের সিদ্ধান্তটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সহজ ছিল না। বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যা পর্যন্তও এ নিয়ে সংশয় কাটেনি। সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলেও জেলা প্রশাসকের সম্মতি না মেলায় বৃহস্পতিবার থেকে জাহাজ চলাচল শুরু করা যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে আগাম টিকিট কাটা পর্যটকদের মধ্যে দেখা দেয় উদ্বেগ।
শেষ পর্যন্ত বুধবার রাত ১১টার দিকে জেলা প্রশাসকের সম্মতি পাওয়ার পর জাহাজ চলাচলের সিদ্ধান্তের কথা জানান সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে প্রথম দিন একটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়।
সরকারের সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ উন্মুক্ত করা হয়। সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি। ফলে পর্যটকদের জন্য দ্বীপ উন্মুক্ত থাকার পরও সেখানে যাওয়ার কার্যকর নৌপথ চালু না হওয়ায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছিল। নৌপরিবহন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন এবং জেলা প্রশাসকের সম্মতি পাওয়ার পর অবশেষে জাহাজ চলাচলের পথ খুলেছে।
প্রথম দিন এমভি বার আউলিয়া ৮৩০ জন পর্যটক নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পর্যায়ক্রমে চলাচল করবে অনুমোদন পাওয়া আরও দুটি জাহাজ। এগুলো হলো এমভি কর্ণফুলি ও এমভি টেকনাফ। তিনটি জাহাজের মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ার ধারণক্ষমতা ৮৫০ জন, এমভি কর্ণফুলির ৭৩২ জন এবং এমভি টেকনাফের ৭১৬ জন। ফলে পর্যটকের চাপ ও চাহিদা বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে তিনটি জাহাজ চলাচল করলে দ্বীপে যাতায়াতের সুযোগ আরও বাড়বে।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, এমভি বার আউলিয়া সকাল ৭টায় কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে এবং দ্বীপ থেকে ফিরবে বেলা আড়াইটায়। এমভি কর্ণফুলি সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করে ফিরবে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে। অন্যদিকে এমভি টেকনাফ সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে কক্সবাজার ছাড়বে এবং সেন্টমার্টিন থেকে ফিরবে বিকেল সাড়ে ৩টায়।
জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় পর্যটকদের সামনে আবারও খুলে গেল দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ। তবে এবার ভ্রমণের সুযোগের পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত ও রাত্রিযাপনের সুযোগ থাকবে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। তবে পর্যটকদের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতা। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি দ্বীপে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশগত চাপ কমানো।
অর্থাৎ, এবার সেন্টমার্টিন ভ্রমণ শুধু টিকিট কেটে জাহাজে ওঠার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণের দায়িত্বও।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নীল জলরাশি, প্রবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের কারণে সেন্টমার্টিন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। কিন্তু অপরিকল্পিত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য, অতিরিক্ত শব্দ ও মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের কারণে দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য দীর্ঘদিন ধরে হুমকির মুখে রয়েছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় পর্যটকদের জন্য এবারও বেশ কিছু বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও করা যাবে না।
এ ছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ কোনো ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষতি করা যাবে না। সমুদ্রসৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো ধরনের যানবাহন চলাচলও নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
পরিবেশবিদদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, পর্যটকদের অসচেতন আচরণ এবং দ্বীপের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের বিষয়টি বিবেচনায় এসব বিধিনিষেধকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অপেক্ষায় ছিলেন। জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দ্বীপের স্থানীয় অর্থনীতিতেও।
বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে পর্যটনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে গিয়ে দ্বীপের পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সেন্টমার্টিনের মূল আকর্ষণ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য। এই সম্পদ নষ্ট হলে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দ্বীপটির আকর্ষণও একসময় হারিয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় পর্যটকদের জন্য স্বস্তি ফিরেছে। এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, নিয়মিত ও নিরাপদ নৌযাত্রার পাশাপাশি সরকারি বিধিনিষেধ যথাযথভাবে কার্যকর হবে। পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গেলে সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ যেমন থাকবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অক্ষত থাকবে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর