আজ আকাশের বুক ভারী। প্রকৃতি যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। হৃদয়ের গভীরে এক অনির্বচনীয় শূন্যতা—যা কোনো শব্দে প্রকাশ করা কঠিন। এটুকুই স্পষ্ট, আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় নিভে গেল। যাঁকে ঘিরে আমাদের যৌবনের উত্তাল দিনগুলো আবর্তিত হয়েছিল, যাঁর কণ্ঠে ভর করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পেয়েছিল দিশা—সেই আপোষহীন দেশনেত্রী, সেই মমতাময়ী মা বেগম খালেদা জিয়া আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন।
তাঁর জানাজায় দাঁড়িয়ে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল আশির দশকের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলো। রাজপথে ধ্বনিত স্লোগানের প্রতিটি শব্দে আজও অনুভব করি তাঁর সাহস, দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক সংগ্রামের দীপ্ত ছাপ।

আন্দোলনের দিন ও প্রথম সাক্ষাৎ
১৯৮৮ সালের মে মাস। তখন আমি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সাংগঠনিক শক্তি সুসংহত করার লক্ষ্যে আমরা ঢাকায় যাই। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ধানমণ্ডি ২৭-এ তৎকালীন মহাসচিব ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়।
তাঁর নির্দেশনায় ওই বছরের নভেম্বর মাসে টঙ্গী পৌর অডিটোরিয়ামে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের সভাপতিত্বের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা কখনো সহজ নয়। সম্মেলনের পরপরই মতভেদ ও গ্রুপিং শুরু হয়, যা আন্দোলনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এই সংকটের খবর পৌঁছে যায় বেগম খালেদা জিয়ার কাছে। ব্যারিস্টার সালাম তালুকদার আমাকে নিয়ে যান তাঁর সামনে। সেই প্রথম কাছ থেকে দেখা এই আপোষহীন নেত্রীকে। শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, আন্দোলনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের ভেতরের কোন্দল তিনি মেনে নেবেন না। তাঁর সেই নির্দেশই আমাদের জন্য ছিল চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা।
সেদিন রাতেই জরুরি বৈঠকের মাধ্যমে বিভেদ নিরসনের সিদ্ধান্ত হয়। দলের বৃহত্তর স্বার্থে আমি সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করি।
এক সংগ্রামের নাম
স্বৈরাচার এরশাদের সেনাশাসনের অন্ধকার সময়ে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাঁর আপোষহীন অবস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি প্রমাণ করেছিলেন—নেতৃত্বের শক্তি লিঙ্গে নয়, আদর্শে।
রাজপথের প্রেরণা
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কমিটি গঠনের পর তিনি নিজেই আমাদের ডেকে নেন। ধানমণ্ডির সেই কার্যালয়ে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের রূপরেখা তুলে ধরেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই কথাগুলোই আমাদের রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস জুগিয়েছিল।
কারাগার ও নেতৃত্ব
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে আমিসহ অনেক সহযোদ্ধা গ্রেপ্তার হয়ে গাজীপুর জেলে বন্দী হই। কিন্তু কারাগারের চার দেয়ালও তাঁর নেতৃত্বের প্রভাব থামাতে পারেনি। আমাদের মুক্তির দাবিতে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের ফলেই আমরা দ্রুত মুক্তি পাই। অল্পদিনের মধ্যেই পতন ঘটে স্বৈরাচার এরশাদের। গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে যায়।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে
১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণের রায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, নারী শিক্ষার বিস্তার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তাঁর অবদান জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
আমি পরে বিসিএসের মাধ্যমে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দিয়ে সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হই। পেশাগত কারণে তাঁর সরাসরি সান্নিধ্য না পেলেও দূর থেকেই দেখেছি—তিনি কীভাবে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন এবং দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
অবদান ও উত্তরাধিকার
সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা, ভ্যাট প্রবর্তন, মুক্ত বাজার অর্থনীতির সূচনা এবং দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আপোষহীন নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।

শেষ কথা
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ভোর ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। রেখে গেছেন সংগ্রামের এক উজ্জ্বল ইতিহাস ও কোটি মানুষের ভালোবাসা।
তিনি আজ নেই, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতিটি শ্বাসে, স্বাধিকার চেতনার প্রতিটি স্পন্দনে তিনি বেঁচে থাকবেন। আমার মতো অসংখ্য কর্মীর হৃদয়ে তিনি থাকবেন প্রেরণার এক অবিচল উৎস হয়ে।
আল্লাহ পাক তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
লেখক: ড. মো. আশরাফুর রহমান
ডিআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সর্বশেষ খবর
খোলা কলাম এর সর্বশেষ খবর