মাসউদুর রহমান, নেপাল থেকে ফিরে: হিমালয়ের দেশ নেপাল জলবায়ু পরিবর্তনের এক মূর্তমান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান মাত্র ০.১ শতাংশ হলেও, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি আজ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত। দ্রুত গলে যাওয়া হিমবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ভয়াবহ ভূমিধস—সব মিলিয়ে নেপালের প্রকৃতি এক চরম সন্ধিক্ষণে।
সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুযায়ী, গত চার দশকে নেপালের হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় ০.০৫° সেলসিয়াস হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ হিমবাহ হারিয়ে গেছে। ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, বরফ গলে বেরিয়ে আসছে দশকের পর দশক জমে থাকা বর্জ্য এবং মৃতদেহ, যা নিচের পাহাড়ি জনপদগুলোর পানির উৎসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। এছাড়া, অকাল বন্যা এবং 'গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড' (GLOF) বা হিমবাহ লেক বিস্ফোরণের ঝুঁকি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু পরিবেশ নয়, এর প্রভাব পড়েছে নেপালের অর্থনীতিতেও। ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটির জিডিপি ২.২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নেপাল সরকার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নেপাল ২০৪৫ সালের মধ্যে শূন্য কার্বন নিঃসরণ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে নেতিবাচক কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। নেপাল বর্তমানে তার ভূখণ্ডের প্রায় ৪৫ শতাংশ বনভূমি সফলভাবে রক্ষা করছে। এছাড়া, পশ্চিম কর্ণালী অঞ্চলে এশিয়ার অন্যতম প্রথম ‘মৎস্য অভয়ারণ্য’ ঘোষণা করা হয়েছে যা জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একটি মাইলফলক। ২০২৪-২৫ সালে এভারেস্ট থেকে প্রায় ৮৫ টন বর্জ্য এবং বিশাল পরিমাণ মানুষের মলমূত্র অপসারণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের জন্য সরকার ১০০ কোটি রুপির বেশি বাজেট বরাদ্দ করেছে। পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষকদের ‘ক্লাইমেট-স্মার্ট’ কৃষিপদ্ধতি শেখানো হচ্ছে, যেখানে কম পানি ব্যবহার করে ফলন বাড়ানো সম্ভব।
নেপাল ২০২৬ সালে 'স্বল্পোন্নত দেশ' (LDC) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এই উত্তরণকে টেকসই করতে দেশটির সামনে বড় কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। 'ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন' (NDC) ৩.০ বাস্তবায়ন করে নেপাল তার নতুন 'ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন' অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে মিথেন গ্যাস ক্যাপচার এবং টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে চায়। জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন খাতে প্রায় ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পরিবেশ সচেতনতাকে জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
নেপাল একা লড়াই করে হিমালয় বাঁচাতে পারবে না। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, আরও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে, আঞ্চলিক সহযোগিতা: হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর (ভারত, চীন, ভুটান) সাথে যৌথভাবে নদী এবং হিমবাহ ব্যবস্থাপনা চুক্তি করতে হবে। অবকাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা: নেপালের নগরায়ণ যেভাবে কৃষিভূমি গ্রাস করছে (২০২৬ সালের মধ্যে আরও ২০৫ বর্গ কিমি চাষযোগ্য জমি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা), তা রোধ করে 'গ্রিন আরবান প্ল্যানিং' বাস্তবায়ন করতে হবে। ক্ষতিপূরণ ও জলবায়ু অর্থায়ন: উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ফান্ডের মাধ্যমে আরও জোরালো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে।
নেপালের হিমালয় কেবল একটি দেশের সীমানা নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের পানির আধার। নেপালের এই পরিবেশগত যুদ্ধ আসলে অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। সরকার ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিশ্ব সম্প্রদায়ের সক্রিয় সমর্থনই পারে হিমালয়ের এই অনন্য সৌন্দর্য ও বাস্তুসংস্থানকে আগামীর জন্য টিকিয়ে রাখতে।
লেখক: মাসউদুর রহমান
লেখক ও সাংবাদিক
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
খোলা কলাম এর সর্বশেষ খবর