কুমিল্লা টাউনহল মাঠে 'তারুণ্যের ভাবনায় আগামীর বাংলাদেশ' শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনায় মূল আলোচক হিসেবে জুলাই যোদ্ধা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস বলেছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আপনারা আসন্ন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে যাবেন, ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। মনে রাখবেন, আপনি শুধু একটি ভোট দিচ্ছেন না, আপনি বহন করছেন ৭১-এর উত্তরাধিকার এবং জুলাইয়ের সাহস। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র সবচেয়ে ভালো কাজ করে তখনই, যখন ভোটাররা শুধু অনুভব নয়, তা নিয়ে ভাবে। মনে রাখবেন, নির্বাচন শুধু পরবর্তী পাঁচ বছরের বিষয় নয়। এটি পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। সুতরাং জেনে বুঝে আপনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোট আপনার অধিকার। ভোট দেওয়ার আগে ভাবুন ২০৪১ সালের বাংলাদেশ এবং তার পরের বাংলাদেশকে। ভাবুন এমন শিক্ষা ব্যবস্থা, যা শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত করবে। এমন কর্মসংস্থান, যা তরুণদের দেশে থেকেই ভবিষ্যৎ গড়তে উৎসাহিত করবে। যা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য জলবায়ু সহনশীলতা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন করবে।
ড. সায়মা বলেন, বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের পরিচয়ের কথা বলতে গেলে দুটি বিষয় সবার ঊর্ধ্বে উঠে আসে। একটি হলো ১৯৭১, যখন সাধারণ মানুষ, কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমরা ভয়ের নয়, স্বাধীনতার পথ বেছে নেবো। আরেকটি হলো চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান। যখন এই দেশের তরুণরা আবারও ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য নিজেদের কণ্ঠ তুলে ধরেছিল। জুলাই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে ১৯৭১-এর প্রতিরোধ, সাহস ও দায়িত্ববোধের চেতনা শেষ হয়ে যায়নি, তা আজও তরুণদের মধ্যেই জীবিত।
তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করুন, যারা প্রমাণ করবে, ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট না করেই রাজনীতি করা যায়। আপনারা কোনো ছোট গোষ্ঠী নন, আপনারাই এই দেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশ। তাই নীতি দেখে ভোট দিন, দৃষ্টিভঙ্গি দেখে ভোট দিন, দক্ষতা দেখে ভোট দিন। ইশতেহার পড়ুন, উন্নয়ন পরিকল্পনা বুঝুন, অগ্রাধিকার বিশ্লেষণ করুন। কারিশমা জনসমাগম ঘটাতে পারে কিন্তু দক্ষতাই রাষ্ট্র গড়ে তোলে। আপনার ভোট কোনো রাজনীতিবিদের প্রতি অনুগ্রহ নয়। এটি আপনার ভবিষ্যৎ, আপনার বাবা-মা এবং পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি একটি অঙ্গীকার।
'সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ' নামক একটি সংগঠনের আয়োজনে মুক্ত আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা ৬ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরী। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। প্রধান আলোচনা পেশ করেন জুলাই যোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস। সহ-আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জুলাই যোদ্ধা, ডাকসু ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান, রাকসুর এজিএস প্রার্থী জাহিন বিশ্বাস এশা, জুলাই শহীদ সাদমানের মা কাজী শারমিন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান না হলে আজ আমরা এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারতাম না। জুলাই এসেছিল ১৯৭১ এর ই পরম্পরায়। ৭১ আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, ২৪ সেই স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, একটি পক্ষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পায়তারা করেছে। ১৯৭১ এ দেশের তরুণরা যেভাবে পাকিস্তানের হাত থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল ঠিক সেভাবেই ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ পনের বছরের স্বৈরাচারকে হটিয়ে আমাদেরকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা যেভাবে ২৪ এর জুলাই কে স্মরণ করব ঠিক তেমনিভাবে ১৯৭১ কে সম্মানের সাথে স্মরণ করব। কখনোই জুলাইকে দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধকে রিপ্লেস করতে দেবো না।
তিনি আরও বলেন, যারা মহান মুক্তিযোদ্ধাকে ধারণ করে না তারাই জুলাইকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে রিপ্লেস করতে চায়। এদেশের তরুণরা কি করতে পারে তা দীর্ঘ পথ চলায় আমরা দেখেছি। ১৯৫২ ভাষা আন্দোলন, উত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান এদেশের তরুণরাই ঘটিয়েছে। এদেশের তরুণ সমাজ সংকটময় মুহূর্তে বারবার জেগে ওঠে। তরুণরাই আগামীর আধুনিক ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে।
আবিদুল ইসলাম খান বলেন, যে জুলাইয়ের শক্তি নিয়ে আমরা মাঠে নেমেছিলাম, আজ দেড় বছর অতিবাহিত হয়েছে, সেই দেড় বছরে যারা জুলাই অভ্যুত্থানে সম্মুখ সারির যোদ্ধা ছিলেন, যাদের হাতে তরুণ প্রজন্মের নতুন ভবিষ্যৎ দেখতো বাংলাদেশ, প্রত্যেকটা ব্যক্তি তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। এই জুলাইকে আমরা যথায়থ উপস্থাপন করতে পারিনি। আমরা কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? আমরা চেয়েছিলাম আর কোনো হানাহানি চলবে না। আর কোনো চাঁদাবাজী, টেন্ডাবাজী ও দখলদারিত্ব চলবে না। এমন একটা বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, যেখানে নিরাপদে বাসা থেকে বের হতে পারবো এবং বাসায় আমি ফিরে যেতে পারবো। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমরা যে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, সেই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি আমাদের মাঝে আবার চলে এসেছে অল্প সময়ের মধ্যে।
মুক্ত আলোচনায় জুলাই যোদ্ধাসহ কুমিল্লার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর