ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কক্সবাজারে ভোটের প্রস্তুতির পাশাপাশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে ঝুঁকির চিত্র। জেলার চারটি সংসদীয় আসনে মোট ৫৯৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩২৯টিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়। অর্থাৎ মোট কেন্দ্রের প্রায় ৫৫ শতাংশেই বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রশাসন। নির্বাচনের প্রাক্কালে এই পরিসংখ্যান স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, কক্সবাজার–৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই আসনের ১৮২টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০৯টি ঝুঁকিপূর্ণ। সদর উপজেলার ৮২টির মধ্যে ৫০টি, রামুর ৬৪টির মধ্যে ৩৫টি এবং ঈদগাঁওয়ের ৩৬টির মধ্যে ২৪টি কেন্দ্র তালিকাভুক্ত হয়েছে। জনবহুল এলাকা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অতীতের সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা এখানে বড় বিবেচ্য বিষয় হিসেবে ধরা হয়েছে।
কক্সবাজার–১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে মোট ১৮০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৯৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। চকরিয়ায় ১৩০টির মধ্যে ৭৩টি এবং পেকুয়ায় ৪৭টির মধ্যে ২০টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অতীতের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
কক্সবাজার–২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে ১২৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫৯টি ঝুঁকিপূর্ণ। মহেশখালীর ৮৬টির মধ্যে ২৭টি এবং কুতুবদিয়ার ৩৮টির মধ্যে ৩২টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়। বিশেষ করে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সীমান্তবর্তী কক্সবাজার–৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে ১১৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬৮টি ঝুঁকিপূর্ণ। উখিয়ার ৫৬টির মধ্যে ৪০টি এবং টেকনাফের ৬১টির মধ্যে ২৮টি কেন্দ্র তালিকাভুক্ত হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রার্থীদের অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং অতীতের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ, আনসার, মোবাইল টিম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েনের রয়েছে।
এদিকে ভোটের একদিন আগে থেকে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও চাপা উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেকেই নিরাপদ পরিবেশে ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে নারী ভোটার ও দূরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বেশি।
সদর উপজেলার খরুলিয়া এলাকার বাসিন্দা ও রামুর ব্যবসায়ী আবদুল হাবিব উল্লাহ বলেন, আমি নিয়মিত ভোট দিই। কিন্তু এবার কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ শুনে পরিবার থেকে একটু ভয় দেখাচ্ছে। চাই, ভোটের দিন যেন কোনো উত্তেজনা না হয়। আমরা শান্তিতে ভোট দিয়ে বাসায় ফিরতে চাই।
উখিয়ার রাজাপালং এলাকার গৃহিণী পপি আক্তার বলেন, আমরা রাজনীতি বুঝি না, কিন্তু ভোটটা নিজের মতো দিতে চাই। কেন্দ্রে যদি ঝামেলা বা চাপ থাকে, তাহলে নারীরা বেশি ভয় পায়। নিরাপত্তা থাকলে আমরা নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারব।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রশাসনের প্রস্তুতি ও ভোটারদের প্রত্যাশা মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ৩২৯টি কেন্দ্র শেষ পর্যন্ত কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেটিই এখন কক্সবাজারের নির্বাচনী পরিবেশের বড় পরীক্ষা। এমটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গত মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মিলনায়তনে রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর আহমেদ জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে কাঁটাতারের বেড়া মেরামত, চেকপোস্ট স্থাপন, নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জেলার চারটি আসনের দুর্গম ভোটকেন্দ্রেও সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত থাকবে। কেন্দ্রের ভেতরে বা বাইরে কোনো অনিয়ম বা সহিংসতা দেখা দিলে সেনাবাহিনী পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সঙ্গে সমন্বয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তিনি।
এরআগে সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুতফা জামান জানান, ৩ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী ৪৬টি অভিযান চালিয়েছে। এতে ৬টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল দেশীয় অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি আলোচিত হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ক্যাম্পের বাইরে অবৈধভাবে বসবাসকারী ১ হাজার ১৪৯ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। সভায় পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর