কক্সবাজার সদরের ঝিলংজার খরুলিয়া চরপাড়া। নদীতীরবর্তী এই জনপদের অধিকাংশ মানুষই ভাসমান, বাস্তুচ্যুত বা বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে অল্প দামে জমি কিনে গড়ে তোলা বসতিতে থাকেন। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কম, স্থায়ী মালিকানার কাগজপত্র নিয়ে জটিলতা আছে অনেকের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই ভাঙাচোরা সামাজিক কাঠামো আর অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়েই এখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী একটি চক্রের নেতৃত্বে আছেন মোহাম্মদ আলমগীর। দিনে-দুপুরে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, জমি দখল, মাটি লুট, ডাকাতি ও ছিনতাই- সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের দখলদার শাসন কায়েম করেছে চক্রটি।
সম্প্রতি চাঁদা না পেয়ে এই চক্রটি স্থানীয় ব্যবসায়ী শফিউল আলমকে কুপিয়ে মারাত্মক ভাবে আহত করেছে।
ভুক্তভোগি পরিবারটির অভিযোগ, আলমগীরের নেতৃত্বে চক্রটি শফিউলের কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সকালে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেদিন সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর শফিউলকে লক্ষ্য করে প্রথমে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করা হয়। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। তার একটি পায়ে গভীর কোপ লেগেছে। পরিবার বলছে, ক্ষত এতটাই মারাত্মক যে এক পা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, অবস্থাও আশঙ্কাজনক। হামলার সময় তার পকেটে থাকা ৪৩ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। শফিউলের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে তাদেরও অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করে সন্ত্রাসীরা।
এই ঘটনার ছয় দিন পর, ২৬ ফেব্রুয়ারি শফিউলের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় মোহাম্মদ আলমগীরকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া আসামি করা হয়েছে, শামশুল আলমের ছেলে মোহাম্মদ শাকিল, ফজল করিমের ছেলে ছৈয়দ কাসেম, মকবুল হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ হাসেম, আবদুল কাদেরের ছেলে নুরুন্নবী এবং ফজল করিমের ছেলে শামশুল আলমকে। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র ব্যবহার এবং লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই চক্রটির বিরুদ্ধে সদর থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। শনিবার ভোররাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে চক্রটির প্রধান আলমগীকে গ্রেফতার করেছে। তবে এখনো বীরদর্পে ঘুরছে তার অনুসারীরা। এতে পুরো এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়েছে।
শফিউল আলম এখনো হাসপাতালের শয্যায়। তার স্ত্রী মনোয়ারা দাবি, দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে তারা নিরাপত্তাহীনতায় থাকবেন।
খরুলিয়া চরপাড়ায় গিয়ে কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। প্রায় সবাই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে চাঁদা আদায় করা হয়। কেউ নতুন ঘর তুললে, জমি ভরাট করলে বা ব্যবসা শুরু করলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়। না দিলে হুমকি, কখনও হামলা শিকার হতে হয়।
একজন বয়স্ক বাসিন্দা বলেন, আমরা বেশির ভাগই বাইরে থেকে এসে এখানে ঘর করেছি। কারও শক্তিশালী পেছন নেই। তাই ভয়েই থাকি।
আরেকজনের ভাষ্য, রাতে মাদক কারবার হয়, দিনে জমি নিয়ে ঝামেলা। কেউ প্রতিবাদ করলে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চক্রটি শুধু ছিনতাই-চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়। জমি দখল ও মাটি লুটকে তারা ব্যবসায় পরিণত করেছে। নদীতীরবর্তী হওয়ায় চরাঞ্চলে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ লেগেই থাকে। সেই বিরোধে পক্ষ নেওয়া, ভয় দেখানো কিংবা জোর করে দখল করে দেওয়া- এসবের বিনিময়ে অর্থ আদায় যেন তাদের নেশায় পরিণত হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, এতদিন ভয়ে কেউ মুখ খোলেননি। শফিউলের ওপর হামলার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। কয়েকজন বলছেন, এবার যদি বিচার না হয়, তাহলে আর কেউ নিরাপদ থাকবে না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুর রশিদ বলেন, আলমগীরের নেতৃত্বাধীন চক্রটির কারণে পুরো এলাকা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে। তার মতে, সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কেউ নিরাপদ বোধ করছে না।
তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে এক ফেরিওয়ালা ওই এলাকায় পণ্য বিক্রি করতে গেলে তাকে মারধর করা হয় এবং তার কাছে থাকা প্রায় তিন হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে কান্নাকাটি করে ওই হকার আমাকে ফোন করেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে আলমগীর আমাকে দিকে অস্ত্র তাক করেন।
আব্দুর রশিদ বলেন, পরে নিজ এলাকার লোকজন নিয়ে সেখানে গেলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যান। এরপর তাদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ১০ থেকে ১২টি ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে কিরিচ, চাইনিজ কুড়াল, দা ও হকিস্টিক রয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে অবহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সচেতন মানুষের মতে, খরুলিয়া চরপাড়ার সামাজিক বাস্তবতা এই ঘটনার পেছনে বড় প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। অধিকাংশ পরিবার অস্থায়ী ঘরে থাকে, অনেকের জমির দলিল-নকশা অসম্পূর্ণ। শিক্ষার হার কম, সংগঠিত সামাজিক নেতৃত্বও দুর্বল। ফলে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের পক্ষে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়ে ওঠেছে।
স্থানীয় এক শিক্ষার্থী বলেন, এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি মানুষ খুব কমই অনুভব করে। সমস্যা হলে অনেকেই থানায় যেতে চান না। এই সুযোগেই অপরাধীরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছমি উদ্দিন বলেন, গতকাল রাতে প্রধান আসামি আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চারটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।।
ওসি আরও বলেন, বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। একই সঙ্গে ঝিলংজার খরুলিয়া চরপাড়া এলাকায় বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর