দেশজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহন খাতে। বেড়ে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও ট্রেইলরের ভাড়া। যেসব ব্যবসায়ীর নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে, তারা তাও ব্যবহার করতে পারছেন না জ্বালানি সংকটের কারণে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত বাজারদরে প্রভাব ফেলবে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন,সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংগ্রহে সমস্যার কারণে পরিবহন ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকাসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের ভাড়া ক্ষেত্রবিশেষে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি পণ্যের ৮০ শতাংশ আসে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নদীপথে ও সড়ক পথে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। ডিজেল সংকটে নদীপথে লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। সেই কারণে চাপ বেড়েছে সড়ক পথে; কিন্তু সড়ক পথেও ট্রাক-কাভার্ডভ্যান চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না। এ সংকটকে পুঁজি করে মালিক-শ্রমিকরা ভাড়া হাঁকাচ্ছে বেশি।
মালিক-শ্রমিকদের অভিযোগ, সরকার জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালেও সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ করতে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। সময়ের অপচয়ে যে লোকসান তা পুষিয়ে নিতে ভাড়া বাড়ানোর বিকল্প দেখছেন না তারা।
জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে স্বাভাবিক সময়ে ১৪ টনের কাভার্ড ভ্যানের গড় ভাড়া থাকে ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা, ২৪ টনের গাড়ির ভাড়া ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। ট্রাক ও ট্রেইলারের ভাড়াও পণ্যের ওজনের সঙ্গে মিল রেখে একই হারে নির্ধারণ হয়। জ্বালানি তেলের সংকটের কাভার্ডভ্যান এবং কনটেইনারবাহী ট্রেইলরের ভাড়াও অস্বাভাকিভাবে বেড়েছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল মিলছে না। দেশের অন্যান্য জেলায় রেশনিং পদ্ধতি উঠে গেলেও চট্টগ্রামে এখনো বহাল রয়েছে। চট্টগ্রামে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল দিচ্ছে। কিন্তু ঢাক-চট্টগ্রাম রুটে একটি ট্রাকের জন্য সাড়ে ৩শ লিটারের বেশি জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। একবার ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল নিতে গেলে চার ঘণ্টার বেশি অপেক্ষায় থাকতে হয়। ফলে আগে যে হারে ট্রিপ (ভাড়া) পরিচালনা সম্ভব হতো এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই ট্রাক ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের রেয়াজুদ্দিন বাজারে সবজি নিয়ে আসা ট্র্রাকচালক মোহাম্মদ হানিফ জানান, বগুড়া থেকে চট্টগ্রামে কাঁচা মরিচসহ সবজি পরিবহন করেন তিনি। আগে ভাড়া নিতেন ২৭ হাজার টাকা। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে এখন ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার টাকা নিতে হয়। এর কমে ট্রিপ মারলে তাদের পোষাচ্ছে না।
সাভারের আশুলিয়া ইপিজেড থেকে তৈরি পোশাক নিয়ে চট্টগ্রামে আসা কাভার্ডভ্যান চালক সুমন জানান, স্বাভাবিক সময়ে কাভার্ডভ্যানের ভাড়া ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। কিন্তু সেই টাকায় ভাড়া নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে সময় অনুযায়ী তেলের জন্য সময় চলে যাচ্ছে অন্যদিকে আগের মতো পাম্পগুলোতে তেল পাচ্ছি না পরিমাণ মতো।
কাভার্ডভ্যানের মালিক নেওয়াজ উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার যাওয়ার ভাড়া আজ ৩০ হাজার টাকা, ২৯ হাজার টাকা চলছে। আর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসতে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এই পথের ভাড়া মারতে গেলে আমাদের মালিকদের ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা থাকতে হবে। তিন থেকে চারদিন লাগে গাড়িটা ঘুরে আসতে। একদিনে যদি ৩ হাজার টাকাও হয় তাহলে তিন দিনে ৯ হাজার টাকা, ১০ হাজার টাকা। আমাদের গাড়িটা না চললে গাড়ির কাগজপত্র, খরচ, চাকা, ড্রাইভারসহ বিভিন্ন খরচ মিলে পোষায় না।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির বলেন, বর্তমানে একটি গাড়ির তেল নিতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা করে সময় যাচ্ছে। কোনো কোনো দিন আরও বেশি সময় লাগছে। আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেখানে ছয়-সাত ঘণ্টা সময় লাগত, এখন ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা লাগছে। কখনও কখনও তা দুই থেকে তিন দিনে গড়াচ্ছে। কারণ পাম্পে সিরিয়াল পেতে সময় গচ্চা যাচ্ছে। এতে চালক-শ্রমিকদের দৈনন্দিন খরচ বেড়ে গেছে, যা পণ্য পরিবহন ভাড়ায় যুক্ত হচ্ছে।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর