লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় সাত বছরের শিশু নন্দিনী রায় হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারের খোঁজ নিতে এবং সমবেদনা জানাতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে আদিতমারীর ফলিমারী গ্রামে তাদের বাড়িতে যান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। এ সময় মন্ত্রীর সাথে লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজিব প্রধান, লালমনিরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন বাবুল, জেলা পরিষদ প্রশাসক একেএম মমিনুল হক, জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান এবং পুলিশ সুপার মোঃ আসাদুজ্জামানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
নিহত নন্দিনীর পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সাংবাদিকদের বলেন, যারা ছোট্ট, নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করতে পারে তারা মানুষ নয়, নরপিশাচ। নন্দিনীর পরিবারকে যত দ্রুত সম্ভব আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শতভাগ ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে।
মব সৃষ্টি এবং প্রশাসন ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর প্রসঙ্গে মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, পুলিশ ও প্রশাসন কারো বিপক্ষে নয়। যারা প্রশাসনের গাড়ি ভাঙচুর করেছে তারা স্পষ্টতই ক্রিমিনাল। যারা সরকারকে নানা প্রশ্নের মধ্যে ফেলতে চায়, তারাই এই মব সৃষ্টি করেছে, সাধারণ মানুষ নয়। তদন্ত করে এদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে কোনো নিরপরাধ সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবে হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য তিনি প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ দেন।
এদিকে আইনি প্রক্রিয়ায় বড় অগ্রগতি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র রায় (২২) গতকাল বুধবার আদালতে নিজের অপরাধ ও দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। আসামি নিজে থেকেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় পুলিশের পক্ষ থেকে রিমান্ডের আবেদন করা হয়নি।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, মামলার তদন্ত ও প্রাথমিক পুলিশি কার্যক্রম আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বর্তমানে মূল অভিযুক্ত বিধান ও তার পিতা জেলহাজতে রয়েছে। তবে শিশুটিকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত ও মেডিকেল রিপোর্ট হাতে আসার পরই ধর্ষণের বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হবে।
আজ সরেজমিনে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কোল খালি হওয়া মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার বাতাস। মাটির ধুলোয় গড়াগড়ি দিয়ে কান্না করছেন আর বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন শিশু নন্দিনীর মা। আদরের মেয়েটিকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবাও। স্বজন ও প্রতিবেশীদের দাবি, আইনি জটিলতা এড়িয়ে যেন এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হয়।
উল্লেখ্য, গত সোমবার বিকেলে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টা ক্ষেত থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় নন্দিনী রায়ের বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কোদাল হাতে ক্ষেত থেকে বের হওয়ার সময় প্রতিবেশী রঞ্জিত রায়ের ছেলে বিধান চন্দ্র রায়কে দেখে সন্দেহ হলে ভূ্ট্টা ক্ষেতে তল্লাশি চালিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়।
তবে ঘটনাটি জানাজানি হলে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে এবং ক্ষুব্ধ জনতার ইটপাটকেল ও হামলায় ১৮ জন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। এ সময় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের গাড়ি সহ প্রশাসনের বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের দাবির মুখে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল হককে (ওসি) তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়।
পুলিশ ও প্রশাসন জানিয়েছে, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর হামলা এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করে হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। কোনো ধরনের 'মব জাস্টিস' বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা বরদাশত করা হবে না। বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর