উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারজুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস ও অবকাঠামো ক্ষতির ঘটনা ঘটছে। এরই মধ্যে কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী ও কৈয়ারবিল ইউনিয়নের সংযোগস্থলে কেয়াকাটা খালের ওপর নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধসে পড়েছে। সোমবার সকালে ৪৩ মিটার দীর্ঘ সেতুটি হঠাৎ ভেঙে পড়ায় দুই ইউনিয়নের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা জানান, রোববার সকাল থেকে টানা ভারী বৃষ্টিতে কেয়াকাটা খালের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রবল স্রোতের চাপ এবং দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে সোমবার সকালে সেতুটির একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। ফলে লেমশীখালী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শাহাজিরপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এ সেতুর ওপর নির্ভর করেই প্রতিদিন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ীসহ হাজারো মানুষ চলাচল করতেন। সেতু ধসে পড়ায় জরুরি প্রয়োজনে রোগী পরিবহনেও চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। বিকল্প সড়ক না থাকায় অনেককে কয়েক কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম, সাবের আহমেদ ও মো. রাহাত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সেতুর বিভিন্ন স্থানে ফাটল, দেবে যাওয়া এবং রড বেরিয়ে আসার মতো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি একাধিকবার জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অবশেষে টানা বর্ষণের মধ্যে সেটিই বড় দুর্ঘটনায় রূপ নিল।
লেমশীখালী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শফিউল আলম বলেন, সংস্কারের অভাবে সেতুটি অনেক আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। বিষয়টি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভারী বর্ষণে শেষ পর্যন্ত সেতুটি ধসে পড়েছে। দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ না হলে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবুছদ্দিন জানান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২০০২ সালের দিকে কেয়াকাটা খালের ওপর ৪৩ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতির কারণে প্রায় দুই বছর আগে সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। নতুন সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় তিন কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলেই দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।
কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, সেতুটি আগে থেকেই জরাজীর্ণ ছিল। সোমবার সকালের অতিবৃষ্টিতে এটি ধসে পড়ে। নতুন সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু হবে।
এদিকে টানা ভারী বর্ষণে শুধু কুতুবদিয়াই নয়, পুরো কক্সবাজার জেলাজুড়েই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, মহেশখালী, কক্সবাজার সদর, ঈদগাঁও, কুতুবদিয়াসহ জেলার প্রায় ১০টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে টানা বৃষ্টির কারণে উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ৯ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা ক্যাম্পগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা, পাহাড়ি অঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চলে নতুন করে জলাবদ্ধতা, ভূমিধস ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর দ্রুত পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে মানুষের দুর্ভোগ দ্রুত লাঘব হয়।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর