পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কথিত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ ঘিরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম উইয়ন নিউজ বুধবার (১৫ জুলাই) এক প্রতিবেদনে জানায়, ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নামের একটি বিবৃতি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং প্রদেশটির প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এদিকে আল-জাজিরা, রয়টার্স ও এপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দুই দশক ধরে চলা সশস্ত্র বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে চলতি জুলাই মাসে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলা এবং এর জবাবে সামরিক অভিযানের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, গত ৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত তিনটি বড় হামলায় অন্তত ৪২ জন পুলিশ ও সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭ জুলাই মাঙ্গি ড্যাম এলাকায় এক হামলায় ২৭ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এরপর ‘শাবান’ নামে একটি বড় সামরিক অভিযান শুরু করে পাকিস্তান। দেশটির নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, ওই অভিযানে এখন পর্যন্ত শতাধিক বিদ্রোহী নিহত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কথিত স্বাধীনতার ঘোষণায় আরও দাবি করা হয়, নতুন রাষ্ট্র ইতোমধ্যে নিজস্ব জাতীয় পতাকা, প্রশাসনিক কাঠামো, ‘মা চুকাইন বেলুচানি’ নামে জাতীয় সংগীত এবং ‘বেলুচি ফালুস’ নামে একটি জাতীয় মুদ্রা চালু করেছে। পাশাপাশি ১৫০টির বেশি গ্যাসক্ষেত্র, স্বর্ণ ও তামার খনি এবং ১ হাজার ২০০টির বেশি কয়লাখনির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার দাবিও করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য চাকরি ছেড়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন এবং ভারী অস্ত্র বা ট্যাংক ছাড়াই তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা ধরে রেখেছেন। এছাড়া ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে অপসারণের লক্ষ্য নিয়ে পাঁচ লাখ সদস্যের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, বেলুচিস্তানের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এসব দাবির কোনোটি এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, বেলুচ নেতা মির ইয়ার বেলুচ সিএনএন-নিউজ১৮–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, বেলুচিস্তানে এখন শুধু সশস্ত্র যোদ্ধারাই নয়, সাধারণ মানুষও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে অংশ নিচ্ছেন। তার ভাষ্য, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে প্রদেশটিতে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে এবং ক্রমেই বিমানবাহিনীর ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তিনি আরও দাবি করেন, সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেলুচিস্তান ত্যাগের দাবিতে সোচ্চার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই কথিত স্বাধীনতার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিসরেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে—বেলুচিস্তানের চলমান সংকট কি পাকিস্তানের জন্য নতুন কোনো রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে, নাকি এটি এখনো মূলত অনলাইনভিত্তিক প্রচারণার অংশ—সেটি সময়ই বলে দেবে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর