বর্তমান সময়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। খাবার, পানি, বাতাস এমনকি দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্যের মাধ্যমেও অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানবদেহে প্রবেশ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও কিছু সচেতন অভ্যাস গড়ে তুললে এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।
স্বাস্থ্যবিদদের মতে, নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে এটি বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। গবেষণায় ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত, প্রজনন সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাবসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। শুধু টুথপেস্ট নয়, চিনি, শাক-সবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেও এ ধরনের কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু খাদ্যের মাধ্যমে নয়, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং ত্বকের সংস্পর্শেও মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। তাই ঝুঁকি কমাতে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি কমানোর ৭ উপায়
১. সব সময় ফিল্টার করা পানি পান করুন
ট্যাপ বা টিউবওয়েলের পানিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে। তাই পানি পান করার আগে ফিল্টার ব্যবহার করা ভালো। বিশেষ করে রিভার্স অসমোসিস (RO) প্রযুক্তির ফিল্টার মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণে তুলনামূলক বেশি কার্যকর।
২. প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান
প্লাস্টিকের মোড়কে থাকা খাবার, বিশেষ করে গরম খাবার, থেকে প্লাস্টিক কণা খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তাই যতটা সম্ভব ঘরে রান্না করা তাজা খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৩. কাচ বা ধাতব পাত্রে খাবার সংরক্ষণ করুন
খাবার সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করুন। বিশেষ করে গরম খাবার কখনোই প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা উচিত নয়।
৪. একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন করুন
প্লাস্টিকের গ্লাস, স্ট্র, কাঁটা-চামচ, প্লেট বা ট্রে একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়, যা থেকে সহজেই মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ে। এসবের বদলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহার করুন।
৫. পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ও প্রাকৃতিক তন্তুর পণ্য ব্যবহার করুন
বাজার করার সময় প্লাস্টিকের ব্যাগের পরিবর্তে চট বা সুতির ব্যাগ ব্যবহার করুন। একই সঙ্গে সুতি, উল বা লিনেনের পোশাক ও বিছানার চাদর ব্যবহার করলে সিনথেটিক ফাইবার থেকে ছড়িয়ে পড়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকিও কমে।
৬. সামুদ্রিক খাবার বেছে খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন
সমুদ্রে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে অনেক সামুদ্রিক মাছ ও প্রাণীর শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়। তাই সামুদ্রিক খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে উৎস ও মান সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
৭. প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যের লেবেল পড়ুন
টুথপেস্ট, ফেস স্ক্রাব, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে পলিথিন বা পলিপ্রপিলিনজাতীয় প্লাস্টিক উপাদান থাকতে পারে। কেনার আগে উপাদানের তালিকা দেখে এমন পণ্য এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ পুরোপুরি এড়ানো প্রায় অসম্ভব। তবে নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প গ্রহণের মাধ্যমে দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর