ফ্রিজ এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারের অপরিহার্য একটি গৃহস্থালি যন্ত্র। খাবার দীর্ঘদিন সতেজ রাখতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সংরক্ষণে এর বিকল্প নেই। তবে অনেকেই না জেনেই এমন কিছু অভ্যাস গড়ে তোলেন, যা ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে দেয়। ফলে মাস শেষে বিদ্যুৎ বিলও অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রিজ ব্যবহারের কয়েকটি সাধারণ ভুল অভ্যাস পরিবর্তন করলেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ একটি অভ্যাস হলো প্রয়োজন ছাড়াই বারবার ফ্রিজের দরজা খোলা।
প্রতিবার ফ্রিজের দরজা খোলা হলে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস বাইরে বেরিয়ে যায় এবং বাইরের উষ্ণ বাতাস ভেতরে প্রবেশ করে। এতে ফ্রিজের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেড়ে যায়। কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রা ফিরিয়ে আনতে কম্প্রেসারকে দীর্ঘ সময় এবং বেশি শক্তি দিয়ে কাজ করতে হয়। এর ফলে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যায় এবং কম্প্রেসারের ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
বিশেষ করে, প্রয়োজনীয় জিনিস আগে থেকে ঠিক না করে বারবার দরজা খোলা বা দীর্ঘ সময় ধরে ফ্রিজ খোলা রেখে কিছু খোঁজার অভ্যাস বিদ্যুৎ অপচয়ের অন্যতম কারণ।
অতিরিক্ত খাবার ঠাসাঠাসি করে রাখবেন না: অনেকেই ফ্রিজের প্রতিটি খালি জায়গা খাবারে ভরে ফেলেন। কিন্তু অতিরিক্ত খাবার রাখলে ঠান্ডা বাতাস স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না। ফলে সব খাবার সমানভাবে ঠান্ডা রাখতে ফ্রিজকে বেশি সময় কাজ করতে হয়, যা বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, একেবারে খালি ফ্রিজও শক্তি ব্যবহারে খুব কার্যকর নয়। তাই পরিমিত পরিমাণে খাবার রাখা সবচেয়ে ভালো।
তাপমাত্রা অযথা কমিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই: অনেকেই মনে করেন, তাপমাত্রা যত কম রাখা হবে, খাবার তত ভালো থাকবে। বাস্তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কম তাপমাত্রা নির্ধারণ করলে কম্প্রেসারকে আরও বেশি সময় চালু থাকতে হয়।
সাধারণভাবে ফ্রিজের জন্য ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ফ্রিজারের জন্য মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অধিকাংশ পরিবারের জন্য উপযুক্ত বলে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন।
ফ্রিজ কোথায় রাখছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ: ফ্রিজ যদি রান্নাঘরের চুলা, ওভেন বা সরাসরি রোদ লাগে এমন জায়গার পাশে রাখা হয়, তাহলে বাইরের অতিরিক্ত তাপের কারণে সেটিকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ফলে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যায়।
ফ্রিজ এমন স্থানে রাখা উচিত, যেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে এবং দেয়ালের সঙ্গে কিছুটা ফাঁকা জায়গা থাকে, যাতে কনডেনসারের তাপ সহজে বের হতে পারে।
ফ্রিজের দরজার চারপাশের রাবার সিল (Door Gasket) নষ্ট হয়ে গেলে ঠান্ডা বাতাস ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে। এতে ফ্রিজকে বারবার ঠান্ডা করার জন্য অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করতে হয়।
সিল ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। প্রয়োজন হলে দ্রুত পরিবর্তন করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ফ্রিজের কার্যক্ষমতাও বজায় থাকে।
গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে রাখবেন না: রান্না শেষ করেই গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে রাখলে ভেতরের তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। ফলে কম্প্রেসারকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। খাবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ঠান্ডা হওয়ার পর ফ্রিজে রাখাই সবচেয়ে ভালো।
নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন: ফ্রিজের পেছনের কনডেনসার কয়েল ধুলাবালিতে ঢেকে গেলে তাপ বের হতে সমস্যা হয়। ফলে ফ্রিজের দক্ষতা কমে যায় এবং বিদ্যুৎ খরচ বাড়ে। তাই কয়েক মাস পরপর ফ্রিজের পেছনের অংশ পরিষ্কার করা উচিত।
বিদ্যুৎ বিল কমাতে যেসব অভ্যাস গড়ে তুলবেন:
প্রয়োজনীয় জিনিস একবারেই বের করুন, অযথা বারবার দরজা খুলবেন না। দরজা যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করুন। ফ্রিজ অতিরিক্ত ভর্তি বা একেবারে খালি রাখবেন না। গরম খাবার ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখুন। উপযুক্ত তাপমাত্রা বজায় রাখুন। দরজার রাবার সিল নিয়মিত পরীক্ষা করুন। ফ্রিজকে চুলা বা সরাসরি রোদের কাছ থেকে দূরে রাখুন। কনডেনসার কয়েল পরিষ্কার রাখুন।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সব সময় নতুন বা দামি ফ্রিজ কেনার প্রয়োজন হয় না। বরং দৈনন্দিন কিছু ছোট অভ্যাস বদলালেই বিদ্যুৎ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। অযথা বারবার ফ্রিজের দরজা না খোলা, সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করলে যেমন বিদ্যুৎ বিল কমবে, তেমনি ফ্রিজের আয়ুও দীর্ঘ হবে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর