সবুজ রঙের এক কাপ পানীয় এখন আর শুধু জাপানের ঐতিহ্যের অংশ নয়; এটি বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের নতুন পছন্দ। ক্যাফের মেনু থেকে শুরু করে ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা ইউটিউব—সবখানেই এখন আলোচনায় ‘মাচা’। চা, কফি, ল্যাটে, কেক, আইসক্রিম, স্মুদি থেকে শুরু করে নানা ধরনের ডেজার্টেও ব্যবহৃত হচ্ছে এই উজ্জ্বল সবুজ গুঁড়া। একসময় জাপানের ঐতিহ্যবাহী চা হিসেবে পরিচিত থাকলেও আজ মাচা বিশ্বব্যাপী এক জনপ্রিয় খাদ্য উপাদানে পরিণত হয়েছে।
‘মাচা’ (Matcha) শব্দটি এসেছে জাপানি ভাষা থেকে, যার অর্থ ‘গুঁড়া চা’। এটি বিশেষভাবে চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করা সবুজ চা পাতার সূক্ষ্ম গুঁড়া। সাধারণ গ্রিন টির মতো এটি পানিতে ভিজিয়ে পরে ফেলে দেওয়া হয় না; বরং পুরো গুঁড়াই গরম পানির সঙ্গে ফেটিয়ে পান করা হয়। ফলে চা পাতার সব উপাদানই শরীরে প্রবেশ করে।
বর্তমানে অনেকেই মাচার সঙ্গে দুধ মিশিয়ে ‘মাচা ল্যাটে’ তৈরি করে পান করেন। আবার কফির বিকল্প হিসেবেও এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
মাচার ইতিহাস কয়েকশ বছরের পুরোনো। নবম শতাব্দীর দিকে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা চীন থেকে জাপানে সবুজ চায়ের প্রচলন করেন। সে সময় এটি মূলত ওষুধ এবং দীর্ঘ সময় ধ্যানের সময় সতেজ থাকার উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
তবে মাচাকে সাংস্কৃতিক মর্যাদা দেন ষোড়শ শতাব্দীর জাপানি চা-গুরু সেন নো রিকিউ। তিনি ঐতিহ্যবাহী ‘চা-অনুষ্ঠান’ বা চানোয়ু-এর মাধ্যমে মাচাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তার মতে, চা পান শুধু তৃষ্ণা মেটানোর বিষয় নয়; এটি মনোযোগ, সৌন্দর্যবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক প্রশান্তির একটি শিল্প। তার হাত ধরেই মাচা জাপানি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে মাচার জনপ্রিয়তা কয়েক গুণ বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের আগ্রহ। পুষ্টিবিদদের মতে, মাচায় রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, বিশেষ করে ক্যাটেচিন (Catechin), যা কোষের ক্ষয় কমাতে সহায়ক বলে মনে করা হয়। এছাড়া এতে থাকা এল-থিয়ানিন (L-theanine) মনোযোগ ধরে রাখতে এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এতে থাকা প্রাকৃতিক ক্যাফেইন ধীরে ধীরে শক্তি জোগায়, ফলে অনেকেই কফির পরিবর্তে মাচাকে বেছে নিচ্ছেন।

মাচার বিভিন্ন ধরন
বাজারে সাধারণত দুই ধরনের মাচা বেশি পাওয়া যায়।
সেরিমোনিয়াল গ্রেড (Ceremonial Grade): এটি সবচেয়ে উন্নত মানের মাচা, যা মূলত গরম পানির সঙ্গে ফেটিয়ে সরাসরি পান করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
কুলিনারি গ্রেড (Culinary Grade): তুলনামূলক কম দামের এই মাচা কেক, কুকিজ, আইসক্রিম, স্মুদি, ল্যাটে ও অন্যান্য খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
মাচার বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও বড় অবদান রয়েছে। ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবে প্রতিদিন অসংখ্য মাচা ল্যাটে, ডেজার্ট ও রেসিপির ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে। উজ্জ্বল সবুজ রঙের আকর্ষণীয় পরিবেশন এবং স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় তরুণদের কাছে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের বড় বড় কফি চেইন, রেস্তোরাঁ ও বেকারিগুলোও এখন তাদের মেনুতে মাচাভিত্তিক নানা খাবার ও পানীয় যুক্ত করছে। ফলে জাপানের গণ্ডি পেরিয়ে মাচা এখন বৈশ্বিক খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কয়েক শতাব্দী আগে ধ্যান ও আধ্যাত্মিক চর্চার সহচর হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল মাচার। সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্যবাহী পানীয় আজ স্বাস্থ্য, স্বাদ ও আধুনিক জীবনধারার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পুষ্টিগুণের অনন্য সমন্বয়ের কারণে মাচার জনপ্রিয়তা আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর