শৈশবে রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না হাকোন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া এড়িয়ে চলতেন সবসময়। অথচ সেই অনাগ্রহী যুবরাজই এখন নরওয়ের নতুন রাজা।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বাবা রাজা পঞ্চম হ্যারাল্ডের মৃত্যুর পর আনুষ্ঠানিকভাবে নরওয়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন হাকোন। তবে তার অভিষেকের সময় রাজপরিবারকে ঘিরে একাধিক বিতর্কও আলোচনায় রয়েছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনী ‘হাকোন’-এ তিনি জানিয়েছেন, আশির দশকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার বিষয়টি তাকে অস্বস্তিতে ফেলত। সহপাঠীদের নজর এড়িয়ে চলতেই বেশি পছন্দ করতেন তিনি। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের দায়িত্ব ও অবস্থান মেনে নিতে শুরু করেন।
১৯৯১ সালে ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পর ধীরে ধীরে রাজকীয় দায়িত্ব বাড়তে থাকে তার। বিশেষ করে বাবা রাজা হ্যারাল্ডের স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দায়িত্বে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
রাজপ্রাসাদ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা
বাবা ও দাদার মতো যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে হাকোন পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে।
আত্মজীবনীতে হাকোন লিখেছেন, তিনি বাড়ি থেকে ‘যতটা সম্ভব দূরে’ যেতে চেয়েছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার সংগীত সংস্কৃতি তাকে আকৃষ্ট করেছিল। সেখানে তিনি জনপ্রিয় র্যাপার নাসের একটি কনসার্টেও অংশ নেন। পাশাপাশি সার্ফিং ছিল তার অন্যতম প্রিয় শখ। তার ভাষায়, সমুদ্রে থাকলে তিনি নিজেকে সবচেয়ে স্বাধীন মনে করতেন।

ভালোবাসা, বিতর্ক ও রাজপরিবারে গ্রহণযোগ্যতা
১৯৯৯ সালে নরওয়েতে ফিরে একটি সংগীত উৎসবে মেটে-মারিতের সঙ্গে পরিচয় হয় হাকোনের। পরে তাদের সম্পর্ক প্রকাশ্যে এলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
মেটে-মারিত ছিলেন সাধারণ পরিবারের একজন সিঙ্গেল মা। তরুণ বয়সে বিভিন্ন হাউস মিউজিক ক্লাবেও নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার। এসব কারণে সম্পর্কটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও রাজা হ্যারাল্ড প্রকাশ্যে তাকে স্বাগত জানান। এরপর ধীরে ধীরে বিরোধিতা কমে আসে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাজা হ্যারাল্ডও একসময় পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে সাধারণ পরিবারের মেয়ে সোনিয়াকে বিয়ে করেছিলেন।
হাকোনের মতে, মেটে-মারিত তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছেন। তিনি স্ত্রীকে নিজের আবেগগত ভারসাম্যের উৎস হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।
২০০১ সালে বিয়ে করেন হাকোন ও মেটে-মারিত। তাদের দুই সন্তান—ক্রাউন প্রিন্সেস ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা এবং প্রিন্স সভেরে ম্যাগনুস। এছাড়া আগের সম্পর্ক থেকে মেটে-মারিতের ছেলে মারিউসও পরিবারের সদস্য।
কেলেঙ্কারির ছায়ায় নতুন রাজা
সাম্প্রতিক সময়ে দুটি বড় বিতর্কে নরওয়ের রাজপরিবার চাপে পড়ে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে মেটে-মারিতের ই-মেইল যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ পায়। বিষয়টি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ নীরব ছিলেন তিনি। পরে হাকোন জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে তার স্ত্রীর সময় প্রয়োজন।
এদিকে হাকোনের সৎ ছেলে মারিউস বর্গ হইবির বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ ওঠে। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।
হাকোন এ ঘটনায় অভিযোগকারীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ না করার অবস্থান নেন। তিনি জানান, পরিবারের সন্তানদের দেখভাল করাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরে জুন মাসে ধর্ষণের চার অভিযোগের মধ্যে দুটি এবং পারিবারিক সহিংসতার একটি অভিযোগে মারিউস দোষী সাব্যস্ত হন। আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন। তবে রায়ের বিরুদ্ধে উভয় পক্ষই আপিল করেছে।
আধুনিক নরওয়ের চতুর্থ রাজা
সিংহাসনে আরোহণের মাধ্যমে আধুনিক নরওয়ের ইতিহাসে চতুর্থ রাজা হলেন হাকোন। ১৯০৫ সালে সুইডেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর গণভোটের মাধ্যমে রাজতন্ত্র বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয় নরওয়ে। এরপর ডেনমার্কের প্রিন্স কার্ল নরওয়ের রাজা সপ্তম হাকোন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বর্তমান রাজা হাকোন সেই রাজা সপ্তম হাকোনের প্রপৌত্র।
যে রাজপরিচয় একসময় তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিকেই নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন তিনি। আত্মজীবনীতে হাকোন লিখেছেন, এখন তিনি নিজের অবস্থানের মধ্যে অর্থ ও আনন্দ খুঁজে পান এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ দেখেন।
রাজা হিসেবে নিজের নাম অপরিবর্তিত রাখলে তিনি পরিচিত হবেন নরওয়ের রাজা অষ্টম হাকোন হিসেবে। তবে প্রচলিত রীতিতে চাইলে নতুন কোনো রাজকীয় নামও গ্রহণ করতে পারবেন তিনি।
সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর