বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বর্তমানে ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (এইচটিপি) ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহার করছেন। আর ২৮ দশমিক ১ শতাংশ তরুণ জীবনে অন্তত একবার এসব পণ্য ব্যবহার করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশি তরুণদের ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচ ব্যবহার প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি জনাব জহির উদ্দিন স্বপন, এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান, এমপি; বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব জনাব শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এবং সিটিএফকের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামসের আঞ্চলিক পরিচালক ডা. মাহিন মালিক; শেখ মোমেনা মনি, অতিরিক্ত সচিব, বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ; এ এন এম মঈনুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব, হাসপাতাল অনুবিভাগ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নীতিনির্ধারক, গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জহির উদ্দিন স্বপন, এমপি বলেন, তরুণ প্রজন্মকে নিকোটিন আসক্তি থেকে সুরক্ষা দিতে নতুন ধরনের তামাকপণ্যের বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রচলিত তামাকপণ্যের পাশাপাশি ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন পণ্যের বিপণন ও সহজলভ্যতা তরুণদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষণায় উঠে আসা তথ্য নীতিনির্ধারণ ও তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি তরুণদের সুরক্ষায় এসব পণ্যের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী। গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সমন্বয়ক ডা. অরুনা সরকার।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় ২০২৫ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত অনলাইন জরিপের মাধ্যমে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৫২৪ জন তরুণের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ এবং ২১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী ছিলেন।
গবেষণায় দেখা যায়, নতুন ধরনের তামাকপণ্যের মধ্যে ই-সিগারেটের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। অংশগ্রহণকারীদের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ই-সিগারেট, ১ দশমিক ৩ শতাংশ নিকোটিন পাউচ এবং শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (এইচটিপি) ব্যবহার করছেন।
পুরুষ তরুণদের মধ্যে এসব নতুন ধরনের তামাকপণ্যের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি। পুরুষ অংশগ্রহণকারীদের ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ জীবনে অন্তত একবার এসব পণ্যের যেকোনো একটি ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে, নারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এ হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
প্রচলিত সিগারেট ব্যবহারের সঙ্গে নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহারের সম্পর্কও গবেষণায় উঠে এসেছে। বর্তমানে প্রচলিত সিগারেট ব্যবহারকারী তরুণদের মধ্যে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে, বর্তমানে প্রচলিত সিগারেট ব্যবহার করেন না—এমন অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এই হার ১ দশমিক ৬ শতাংশ।
নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহারের কারণ হিসেবে বর্তমান ব্যবহারকারীদের ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ সামাজিক বা বন্ধুদের চাপের কথা জানিয়েছেন। ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রচলিত তামাকের ব্যবহার কমানো বা এর বিকল্প হিসেবে এসব পণ্য ব্যবহারের কথা বলেছেন। আর ৩১ শতাংশ নিকোটিনের মাত্রা পছন্দ করার কথা জানিয়েছেন।
পণ্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে। বর্তমান ব্যবহারকারীদের ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ ভেপ বা বিশেষায়িত তামাকপণ্যের দোকান থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করেছেন। ৩১ শতাংশ বন্ধু বা সহকর্মীর কাছ থেকে এবং ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ অনলাইন স্টোরের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন। মাত্র ২৪ দশমিক ১ শতাংশ বর্তমান ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, পণ্য কেনার সময় তাঁদের বয়সের প্রমাণপত্র দেখাতে বলা হয়েছিল।
গবেষণায় অংশ নেওয়া তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন দেখার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের ২৬ শতাংশ দোকান বা বিক্রয়কেন্দ্রে, ২০ দশমিক ৮ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং ১৩ দশমিক ২ শতাংশ অন্যান্য মাধ্যমে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন বা বিপণন দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপনের মধ্যে ফেসবুক ছিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্ম—৮৯ শতাংশ। এরপর ইনস্টাগ্রামে ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ইউটিউবে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ বিজ্ঞাপন দেখেছেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান, এমপি বলেন, তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং তরুণদের মধ্যে এসব পণ্যের ব্যবহার তাদের নিকোটিন আসক্তির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। নতুন ধরনের তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা ও আকর্ষণীয় বিপণন তরুণদের এসব পণ্যের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে। তাই তরুণদের সুরক্ষায় এসব পণ্যের ব্যবহার ও সহজলভ্যতা কমানোর পাশাপাশি বিজ্ঞাপন, প্রচার ও বিক্রির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, নতুন ধরনের তামাকপণ্যকে তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্ন ধরনের বিপণন কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ই-সিগারেট কম ক্ষতিকর এবং তামাক ছাড়তে সহায়তা করে। গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দোকান এবং অন্যান্য মাধ্যমে এসব পণ্যের বিপণনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য সতর্কবার্তা। তরুণদের নিকোটিন আসক্তি থেকে রক্ষা করতে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিক্রির ক্ষেত্রে বয়স যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণায় ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান ঘাটতি দূর করার সুপারিশ করা হয়। এসব পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বয়সসীমা নিশ্চিত করা, বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা ও কর আরোপের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিক্রয়কেন্দ্রে পণ্যের প্রদর্শন এবং অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্যের প্রচার নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর