শৈশবেই শরীরে যোগ হয় ঐতিহ্যের একটি চিহ্ন। ম্রো সমাজে ছেলে-মেয়ে উভয়েরই প্রায় তিন বছর বয়সে কান ছিদ্র করার প্রচলন রয়েছে। ম্রো ভাষায় এই প্রথাকে বলা হয় ‘রুইপারাম’। শুধু অলংকার পরার জন্য নয়, এই আয়োজনকে ঘিরে থাকে সামাজিকতা, ভোজ এবং পারিবারিক-সাংস্কৃতিক রীতির নানা অনুষঙ্গ।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন বহু জাতিগোষ্ঠীর জীবন্ত সাংস্কৃতিক ভাণ্ডার। পাহাড়, বন, ঝরনা আর জুমচাষের সঙ্গে এখানে গড়ে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, পোশাক, খাবার, উৎসব ও সামাজিক রীতির বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ম্রো জনগোষ্ঠী।ম্রোদের প্রধান বসতি পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান অঞ্চলে। বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে ম্রোরাও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এসব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, লোকশিল্প, রীতিনীতি ও প্রথা সংরক্ষণ ও গবেষণার কাজ করে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে ম্রো জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৫২ হাজার ৪৫৫ জন—পুরুষ ২৬ হাজার ৭৪২ এবং নারী ২৫ হাজার ৭১৩ জন।
তিন বছরেই কানে ছিদ্র
ম্রো সমাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামাজিক রীতিগুলোর একটি হলো ছোট বয়সে শিশুর কান ছিদ্র করা। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই প্রায় তিন বছর বয়সে কান ছিদ্র করা হয়। বিভিন্ন বাংলা শিক্ষামূলক সূত্রেও ম্রো সমাজের এই রীতির উল্লেখ রয়েছে।
ম্রোদের প্রচলিত রীতিনীতি নিয়ে প্রকাশিত একটি নৃতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক বর্ণনায় এই কান ছিদ্র করার রীতির নাম ‘রুইপারাম’ বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথাগতভাবে শিশুর তিন বছর বয়সে এই অনুষ্ঠান করা হয়। অনুষ্ঠানটি কেবল শিশুকে নিয়ে পরিবারের একটি ব্যক্তিগত আয়োজন নয়; পাড়া-প্রতিবেশীকেও এতে যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, শিশুর কানে ছোট্ট একটি ছিদ্র তৈরি করার ঘটনাটি ম্রো সমাজে বৃহত্তর সামাজিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত একটি রীতি হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
কান ছিদ্রের সঙ্গে অলংকারের সম্পর্ক থাকায় অনেক সংস্কৃতিতে এটি প্রধানত নারীদের সাজসজ্জার অংশ হিসেবে দেখা হয়। ম্রোদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। গবেষণামূলক বর্ণনায় পুরুষ ও নারী—উভয়ের কান ছিদ্র করার প্রচলনের কথা পাওয়া যায়। এ কারণে ম্রো সমাজের এই রীতিকে শুধু ‘শিশুর কানে দুল পরানোর আয়োজন’ হিসেবে দেখলে এর সামাজিক তাৎপর্য পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এটি তাদের ঐতিহ্য, সামাজিক পরিচয় ও অলংকার-সংস্কৃতির একটি অংশ।
ম্রো সংস্কৃতিতে অলংকারের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। গবেষণাধর্মী লেখাগুলোতে ম্রো নারীদের বিভিন্ন ধরনের গয়না, পুঁতির অলংকার, কানের অলংকার ও ধাতব গয়না ব্যবহারের কথা পাওয়া যায়। ফলে শিশুকালে কান ছিদ্র করার পরবর্তী সাংস্কৃতিক ব্যবহারটি আরও স্পষ্ট হয়—কানের সেই ছোট্ট ছিদ্র পরবর্তী জীবনে ঐতিহ্যবাহী অলংকার ধারণের সুযোগ তৈরি করে।

কেমন হয় সেই আয়োজন?
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, কান ছিদ্র করার জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করা হয়। পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করা হয়। আয়োজনের সঙ্গে ভোজের সম্পর্কও রয়েছে। একটি সাংস্কৃতিক গবেষণাধর্মী সূত্রে বলা হয়েছে, এ অনুষ্ঠানে শূকর ও মোরগ জবাই করে এবং পানীয়সহ অতিথিদের আপ্যায়ন করার রীতি ছিল; গ্রামের একজন বৈদ্য বা স্থানীয় চিকিৎসাজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি শিশুর কান ছিদ্র করতেন।
তবে এই বর্ণনাগুলোকে ম্রো সমাজের সর্বত্র একইভাবে পালিত বর্তমান রীতি হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না। ম্রোদের বিভিন্ন পাড়া ও পরিবারের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে; তাই অঞ্চল, পরিবার ও সময়ভেদে আয়োজনের ধরন ভিন্ন হতে পারে।
পাহাড়ের কোলে ম্রো জীবন
ম্রোদের জীবন দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়, বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। গবেষণায় দেখা যায়, ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবনে জুমচাষ, বনজ সম্পদ ব্যবহার এবং স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে প্রজন্মান্তরে সঞ্চিত জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বান্দরবানের থানচি এলাকায় পরিচালিত একটি গবেষণায় ম্রোদের ঐতিহ্যগত পরিবেশজ্ঞান ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের নানা দিক নথিভুক্ত করা হয়েছে। আরেক গবেষণায় ম্রো সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাস, বন্যপ্রাণী ব্যবহার এবং প্রচলিত সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। গবেষকরা দেখিয়েছেন, কিছু প্রচলিত বিশ্বাস ও নিষেধাজ্ঞা নির্দিষ্ট প্রাণী প্রজাতির সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থাৎ ম্রোদের সংস্কৃতি কেবল পোশাক বা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ সম্পর্কও এই সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নিজস্ব ভাষা ও লিপির গল্প
ম্রোদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Journal of Linguistics-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ম্রো ভাষার গঠন ও ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং ম্রোদের নিজেদের পরিচয় ও ভাষার নাম ব্যবহারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটিতে ম্রোদের ভাষা ও পরিচয়ের সঙ্গে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে। ম্রো ভাষার লিখিত রূপ তৈরির ইতিহাসও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভাষা ও জাতিগত বৈচিত্র্য নিয়ে একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ম্রো ভাষার জন্য একটি নিজস্ব লিপি তৈরি করা হয়, যা ম্রো ভাষাকে লিখিতভাবে সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হয়ে ওঠে।
‘ম্রো’ নামেই পরিচয়ের দাবি
ম্রোদের নিয়ে লেখার সময় নামের ব্যবহারেও সতর্কতা দরকার। বিভিন্ন পুরোনো লেখায় ‘মুরং’ নামটি ব্যবহৃত হলেও ভাষাবিষয়ক গবেষণায় ম্রো জনগোষ্ঠীর নিজেদের পরিচয়ের ক্ষেত্রে ‘Mro’ বা ম্রো নাম ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাই সমকালীন ফিচারে জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয়কে সম্মান করে ‘ম্রো’ নামটিই ব্যবহার করা অধিক উপযুক্ত।
ম্রোদের সাংস্কৃতিক জীবনে নানা সামাজিক ও ধর্মীয় আচার রয়েছে। বান্দরবান জেলা প্রশাসনের জেলা-ব্র্যান্ডিং তথ্যেও ম্রোদের নববর্ষ উদযাপনের নাম ‘চাংক্রান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ম্রো সমাজের বিশ্বাস ও ধর্মীয় চর্চাও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। গবেষণায় ঐতিহ্যগতভাবে প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক শক্তির প্রতি বিশ্বাসের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে খ্রিস্টধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং ম্রোদের নিজস্ব ক্রামা ধর্মীয় চর্চার বিস্তারের কথা পাওয়া যায়।
এখানেও একক কোনো পরিচয়ে পুরো ম্রো সমাজকে ব্যাখ্যা করা যায় না; বিভিন্ন পরিবার ও অঞ্চলে বিশ্বাস ও ধর্মীয় চর্চায় পার্থক্য রয়েছে।
তিন বছরের একটি শিশু। পাহাড়ের কোনো এক পাড়ায় পরিবার ও প্রতিবেশীদের উপস্থিতিতে তার কান ছিদ্র করা হচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে এটি হয়তো নিছক একটি ছোট সামাজিক অনুষ্ঠান। কিন্তু ম্রো সমাজের প্রেক্ষাপটে সেই মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিচয়, প্রথা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যতের অলংকার-সংস্কৃতি।
‘রুইপারাম’ তাই কেবল কানে ছিদ্র করার নাম নয়—প্রচলিত সাংস্কৃতিক বর্ণনায় এটি ম্রো সমাজের একটি জীবনচক্রভিত্তিক রীতির অংশ।
তবে এই ঐতিহ্যকে কেবল ‘অদ্ভুত’ বা ‘ব্যতিক্রমী’ হিসেবে দেখার বদলে এর সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি। কারণ একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির অর্থ সেই জনগোষ্ঠীর জীবন, ইতিহাস ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায়।
বাংলাদেশের ২০২২ সালের জনশুমারিতে ৫২ হাজারের বেশি ম্রো মানুষের উপস্থিতি সেই বাস্তবতারই পরিসংখ্যানগত ছবি। আর পাহাড়ের প্রত্যন্ত পাড়ায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকা রীতিগুলো—যেমন শিশুকালে কান ছিদ্র করার ঐতিহ্য—দেশটির বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জীবন্ত নিদর্শন।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ভিন্ন স্বাদের খবর এর সর্বশেষ খবর