হাসি সবারই সৌন্দর্যের অংশ। তবে ভিয়েতনামের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লু নারীদের হাসিতে রয়েছে একেবারেই আলাদা বৈশিষ্ট্য। তাদের দাঁত কালো। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বহু প্রাচীন রীতি হারিয়ে গেলেও লু জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজও টিকে আছে দাঁত কালো করার এই অনন্য ঐতিহ্য।
একসময় ভিয়েতনামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দাঁত কালো করার প্রচলন ছিল। সময়ের সঙ্গে কিন জনগোষ্ঠীসহ অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই রীতি বিলুপ্ত হয়েছে। তবে লাই চাউ প্রদেশের তাম দুয়ংসহ উত্তর-পশ্চিমের পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী লু জনগোষ্ঠী এখনও তা ধরে রেখেছে।
লু সমাজে দাঁত কালো করা শুধু সৌন্দর্যচর্চা নয়। এটি তাদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, সুন্দরভাবে সারিবদ্ধ কালো দাঁত ছিল নারীর সৌন্দর্যের অন্যতম মাপকাঠি। একসময় জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কালো দাঁতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। কালো দাঁতের নারীদের সক্ষম, সতী ও বিশ্বস্ত হিসেবে বিবেচনা করার সামাজিক বিশ্বাসও ছিল।

যেভাবে কালো করা হয় দাঁত
লু নারীদের দাঁত কালো করার প্রক্রিয়াটি ছিল সম্পূর্ণ ঐতিহ্যনির্ভর ও হাতে তৈরি। পার্বত্য এলাকায় পাওয়া বিশেষ এক ধরনের বনজ উদ্ভিদের কাণ্ড সংগ্রহ করে শুকিয়ে রাখা হতো। পরে কাঠ পুড়িয়ে তার ধোঁয়া ও কালি সংগ্রহ করা হতো।
লোহার টুকরা বা ছুরির সাহায্যে কাঠের গায়ে জমে থাকা কালো কালি সংগ্রহ করে তা আঙুলের সাহায্যে দাঁতে ঘষে লাগানো হতো। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দাঁতকে ধীরে ধীরে কালো করা হতো।
প্রচলিত বিশ্বাসে, এই রীতি দাঁতকে শক্ত রাখতে এবং দাঁতের ক্ষয় রোধ করত। তবে এর সঙ্গে নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাসও জড়িত ছিল। বিশেষ করে দাঁত কালো করার সময় গরম ও শক্ত খাবার এড়িয়ে চলার নিয়ম ছিল।

সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি কিছু
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে লু সমাজেও এসেছে নানা পরিবর্তন। শিক্ষা, সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই রীতির চর্চা আগের তুলনায় কমেছে। ফলে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতেও পড়েছে ঐতিহ্যটি।
তবু লু সম্প্রদায়ের কাছে দাঁত কালো করার রীতি এখনও নিজস্ব পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এটি তাদের অন্য জাতিগোষ্ঠী থেকে আলাদা করে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত রাখে।
এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সামাজিক আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসবে দাঁত কালো করার প্রথাকে তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শুধু সংস্কৃতি সংরক্ষণই নয়, পর্যটকদের কাছেও লু জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হচ্ছে।

ঐতিহ্যের হাসিতে পর্যটনের নতুন গল্প
আজ আগুনের পাশে বসে লু নারীদের দাঁত কালো করার দৃশ্য কেবল একটি পুরোনো সৌন্দর্যচর্চার স্মৃতি নয়। এটি হয়ে উঠেছে তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আধুনিকতার প্রবল স্রোতের মধ্যেও এই প্রথা ধরে রাখার চেষ্টা লু জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক শিকড়ের প্রতি তাদের গভীর টানকে প্রকাশ করে। একই সঙ্গে লাই চাউয়ের ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনেও যোগ করছে নতুন মাত্রা।

লু নারীদের কালো দাঁতের হাসি তাই শুধু সৌন্দর্যের গল্প নয়—এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, পরিচয় ও হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর