গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৪ দিন হাসপাতালে লড়াই করে মারা গেছেন কক্সবাজারের যুবক মোহাম্মদ একরাম। ছেলের মৃত্যুর শোক কাটার আগেই তার বাবা জালাল আহমদ এখন আরেক অভিযোগ নিয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন। তার দাবি, ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার এজাহার তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী লেখা হয়নি। বরং থানার ভেতরে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে তাদের অজান্তে ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের নাম আসামি হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে মামলায় আসামি হওয়া জাকির হোসেনের পরিবারের দাবি, একরামের পরিবার তাকে আসামি করার কথা বলেনি। এমনকি মামলার বাদী জালাল আহমদের সঙ্গে জাকিরের কোনো পরিচয় বা পূর্বপরিচয়ও নেই। তাহলে একরামের পরিবারের দেওয়া তথ্যের বাইরে গিয়ে এজাহারে জাকিরের নাম এল কীভাবে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
এ ঘটনায় বাদী জালাল আহমদ কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এম সাজেদুর রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে জাকিরের স্ত্রী সুমাইয়া নূর উর্মি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস)-এ অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগটি পুলিশ সদর দপ্তর হয়ে কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কাছে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব কক্সবাজার গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দেওয়া হয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে নয়টা। কক্সবাজার শহরের সিটি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গুলিবিদ্ধ হন সমিতি বাজার এলাকার মোহাম্মদ একরাম। পরিবারের দাবি, মুবিন ও বাবু নামের দুই যুবক তাকে গুলি করেন। ঘটনাস্থলে মোহাম্মদ সোহেল ওরফে রহমত নামের আরও একজন ছিলেন বলেও তারা দাবি করেন।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একরামকে উদ্ধার করে প্রথমে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ১৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৪ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়।
একরামের পরিবারের ভাষ্য, ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ এবং স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্য থেকেও ঘটনার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার পরদিন ২ সেপ্টেম্বর একরামের বাবা জালাল আহমদ কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দ্রুত বিচার আইনে মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ৫৪৬। কিন্তু মামলার এজাহার নিয়েই পরে প্রশ্ন তোলেন বাদী ও নিহতের পরিবারের সদস্যরা।
বাদী জালাল আহমদের অভিযোগ, ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মামলা করতে তিনি থানায় গেলে উপপরিদর্শক (এসআই) মিঠুন পালিতসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে থানার দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যান। সেখানে রাইটার দারুস সালামকে দিয়ে এজাহার লেখানো হয়।
জালাল আহমদের দাবি, থানায় যাওয়ার আগেই পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা কয়েকজনের নাম লিখে রাখা হয়েছিল। থানার বাইরে অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে এজাহার তৈরি করার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের তত্ত্বাবধানেই থানার ভেতরে এজাহার লেখা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, এ সময় এসআই মিঠুন পালিত, পরিদর্শক (তদন্ত) বিল্লাল হোসেন ও পরিদর্শক (অপারেশন) শুভন সেখানে ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতেই বিরোধী পক্ষের কাছ থেকে জাকির হোসেনের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয় এবং তার বাবা-মায়ের নাম ও পূর্ণ ঠিকানা এজাহারে যুক্ত করা হয়।
বাদীর সঙ্গে থানায় যাওয়া এক ব্যক্তির দাবি, এজাহার লেখার সময় দারুস সালামের পাশে বসা এক পুলিশ কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে বলতে শোনা যায়, ‘জাকিরের আইডি কার্ড পাওয়া গেছে, ঠিক আছে, ঠিক আছে।’
২ সেপ্টেম্বর রাতে রেকর্ড করা মামলার এজাহারে রেকর্ডকারী কর্মকর্তা হিসেবে পরিদর্শক (তদন্ত) বিল্লাল হোসেনের নাম রয়েছে।
বাদী জালাল আহমদ এবং তার দুই ছেলে জাবের ও আবছারের দাবি, এজাহারে আসামিদের নাম ও তাদের ভূমিকা যেভাবে লেখা হয়েছে, তা তাদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মেলে না। তাদের ভাষ্য, গুলি করার নির্দেশদাতা বা হুকুমদাতা হিসেবে আবুল মনছুর ওরফে লুদুর নাম উল্লেখ করার কথা ছিল। আর সরাসরি গুলি করার অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, সেই মুবিনের নাম আসামির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকার কথা ছিল। কিন্তু এজাহারে জাকিরের নাম যুক্ত করার পাশাপাশি ঘটনার বিবরণ এবং আসামিদের ভূমিকার মধ্যেও পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তাদের দেওয়া মূল বক্তব্য বা লিখিত তথ্য এবং থানায় রেকর্ড করা এজাহারের মূল কপি পাশাপাশি রাখলেই কোথায় পার্থক্য হয়েছে, তা স্পষ্ট হবে। এই পার্থক্য কীভাবে তৈরি হলো, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করছেন তারা।
মামলায় আসামি হওয়া জাকির হোসেন কক্সবাজারের সুগন্ধ্যা ও কলাতলী এলাকার ব্যবসায়ী। তার পরিবারের অভিযোগ, একরামের ঘটনায় মামলা হওয়ার আগেও তাকে বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল।
পরিবারের দাবি, সাতকানিয়ার করাইয়াঘোনা এলাকার মুজিব চেয়ারম্যানের সঙ্গে কলাতলী এলাকায় জমি নিয়ে জাকিরের বিরোধ রয়েছে। এই বিরোধের জেরে মুজিব চেয়ারম্যান বিভিন্ন সময় জাকিরকে হুমকি দিয়েছেন। পরে মুজিব চেয়ারম্যানের সহযোগী হিসেবে পরিচিত লোহাগাড়ার মোহাম্মদ ফারুকের মাধ্যমে জাকিরকে বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
পরিবারটি আরও অভিযোগ করেন, মুজিব চেয়ারম্যান ও ফারুকের মাধ্যমে কক্সবাজার শহরের টেকপাড়া এলাকার এক ব্যক্তির সহযোগিতায় একরামের মামলার এজাহারে জাকিরের নাম যুক্ত করা হয়। অভিযোগে ওই ব্যক্তিকে কক্সবাজার সদর সার্কেলের তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মুজিব চেয়ারম্যান, মোহাম্মদ ফারুক এবং অভিযোগে উল্লেখ করা ওই ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একরাম চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময়ও তাকে দিয়ে জাকির হোসেনের নাম বলিয়ে ভিডিও করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে জাকিরের পরিবার।
পরিবারের দাবি, মুজিব চেয়ারম্যান ও মোহাম্মদ ফারুক হাসপাতালে গিয়ে একরামের কাছ থেকে জাকিরের নাম বলিয়ে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করেন। পরে ওই ভিডিও বিভিন্ন সাংবাদিকের কাছে পাঠানো হয়।
জাকিরের পরিবার বলছে, ওই ভিডিওর মাধ্যমে জাকিরকে মামলার ‘মূলহোতা’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে প্রতিবেদকের হাতে থাকা একটি অডিও রেকর্ডের কথোপকথনের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। জাকিরের পরিবারের দাবি, অডিওতে মোহাম্মদ ফারুককে একরামের ভাই জাবেরের সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। কথোপকথনে তিনি একরামকে সহযোগিতা করার কথা বলেন এবং জাকিরের জামিন না দেওয়ার বিষয়ে জাবেরের বাবাকে বলতে বলেন বলে দাবি করা হয়েছে। একপর্যায়ে তিনি বিষয়টি কাউকে না বলার অনুরোধ করেন বলেও দাবি পরিবারের।
জাকিরের পরিবারের অভিযোগ, ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এজাহারে তার নাম কীভাবে যুক্ত হয়েছে, সে বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মিঠুন পালিত অবগত ছিলেন।
পরিবারের দাবি, জাকিরকে সরাসরি গ্রেপ্তার না করে এসআরবির মাধ্যমে তাকে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া মামলার অন্যতম আসামি মুবিনকে আটকের পর তার ব্যবহৃত অস্ত্র, গুলি চালানোর ঘটনা এবং ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে রিমান্ডে নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বরং থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাকে দিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে দাবি জাকিরের পরিবারের।
জাকিরের পরিবারের দাবি, ১০ সেপ্টেম্বর মামলার বাদী জালাল আহমদ নিজেই জিম্মানামা ও আপসের মাধ্যমে জাকিরের জামিন চেয়েছিলেন। তবে তদন্ত কর্মকর্তা মিঠুন পালিত ও রেকর্ডকারী কর্মকর্তা বিল্লাল হোসেন জামিনের বিরোধিতা করায় জাকিরের জামিন হয়নি বলে পরিবারের দাবি।
একরামের মৃত্যুর ছয় দিন পর ২০ সেপ্টেম্বর জালাল আহমদসহ তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে সদর মডেল থানায় মামলার এজাহার তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, তাদের অজান্তে এজাহারের তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে। আসামিদের নাম ও তাদের ভূমিকা পাল্টে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য এজাহার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিকার চেয়ে জাকির হোসেনের স্ত্রী সুমাইয়া নূর উর্মিও বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
তার অভিযোগ, বাদীর অজান্তে পুলিশের সহযোগিতায় তার স্বামীকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাদের বাড়ি ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার দুরে। অভিযোগটি পুলিশ সদর দপ্তর হয়ে কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কাছে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
একদিকে নিহতের পরিবার বলছে, তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এজাহার লেখা হয়নি। অন্যদিকে আসামি জাকিরের পরিবার বলছে, তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, বাদী ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ পাওয়ার পর মামলাটি তদন্তের জন্য ডিবিতে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে এবং জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর