রাজশাহী সিটি করপোরেশনে (রাসিক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর অনুমোদিত পদ একটি। তবে ওই পদে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন দুই প্রকৌশলী। তাঁদের একজন স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে পদায়িত নিয়মিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. খায়রুল বাকের। অন্যজন নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আহমদ আল মঈন পরাগ, যিনি ২০২৪ সালে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। নিয়মিত কর্মকর্তা যোগদানের পরও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব বহাল থাকায় রাসিকের প্রকৌশল বিভাগে তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা।
তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া রাসিকের জনবলসংক্রান্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশে একই পদে দুই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত ১৫ জুলাই রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর তথ্য চেয়ে আবেদন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ আগস্ট রাসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত চিঠিতে প্রকৌশল বিভাগের জনবলসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করা হয়।
এতে বলা হয়, বর্তমানে রাসিকে দুজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের একজন সরকার কর্তৃক পদায়িত নিয়মিত কর্মকর্তা এবং অপরজন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।
নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে রাসিকের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী অবসরে যাওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত কর্মকর্তা না থাকায় নির্বাহী প্রকৌশলী আহমদ আল মঈন পরাগকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট জারি করা ২৩৮ নম্বর অফিস আদেশে তাঁকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর প্রায় ১৪ মাস পর স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবরের আদেশে মো. খায়রুল বাকেরকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়। পদায়নের পর তিনি রাসিকে যোগদানও করেন। তবে নিয়মিত কর্মকর্তা যোগদানের পরও আহমদ আল মঈন পরাগকে ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। এতে একই পদে দুই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে দুই কর্মকর্তার অফিসকক্ষ, অধীনস্থ জনবল, সরকারি যানবাহনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাঁদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাসিকের প্রকৌশল বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একই পদে দুজন কর্মকর্তা থাকায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এক ধরনের দ্বৈততা তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো বিষয়ে কার নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে, তা নিয়ে অধীনস্থদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, প্রকল্পের কাজ, কারিগরি বিষয় ও দাপ্তরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।
একজন কর্মকর্তা বলেন, নিয়মিত কর্মকর্তা যোগদানের পর দায়িত্বের কাঠামো স্পষ্ট করে দেওয়া হলে অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ করতেও সুবিধা হতো। বর্তমানে একই পদবির দুই কর্মকর্তার কাছে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ যাওয়ায় অনেক সময় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হয়।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, প্রকৌশল বিভাগের কাজের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক, ড্রেন, অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। দায়িত্বের ক্ষেত্রে স্পষ্টতা না থাকলে কোনো সিদ্ধান্তের দায়-দায়িত্ব নিয়েও পরে প্রশ্ন উঠতে পারে। এদিকে, রাসিকের প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নকশা, কারিগরি বিষয়, কাজের অগ্রগতি, মান নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি কাজের তদারকি ও দাপ্তরিক অনুমোদনের সঙ্গে প্রকৌশল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সরাসরি যুক্ত। ফলে একই পদে দুই কর্মকর্তা থাকায় দায়িত্বের সীমারেখা স্পষ্ট না থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়নেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো পদে নিয়মিত কর্মকর্তা পদায়নের পর অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার দায়িত্বের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক আদেশ জারি করা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু রাসিকে নিয়মিত কর্মকর্তা যোগদানের পরও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব বহাল থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে রাসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. খায়রুল বাকের বলেন, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগ আমাকে এখানে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছে।’ একই পদে দুই কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
আর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহমদ আল মঈন পরাগ বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদে আমাকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ওই চিঠিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় আমি এখনো দায়িত্ব পালন করছি।’
এঘটনায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সিনিয়র সহকারী (সচিব) সোহেল রানার কাছে দুই প্রকৌশলীর একই পদে দায়িত্ব পালনে প্রশাসনিক কাঠামো কি বলে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।
তবে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘একই সঙ্গে দুই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের বিষয়টি জেনেছি। এনিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাতে পারবো।’
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর