যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় চালক অসুস্থ হয়ে পড়ায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায় স্কুলবাসটি। ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত বাসে উঠে সেটি থামান ২৭ বছর বয়সী এব্রো আহমেদ। বাসটিতে ছিল ১৯ শিক্ষার্থী। তাঁর সাহসিকতায় প্রাণে বাঁচে সবাই।
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের সেন্ট পলে চালক অসুস্থ হয়ে পড়ায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায় শিক্ষার্থীবাহী একটি স্কুলবাস। বিপদের মুহূর্তে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত বাসে উঠে সেটি থামান ২৭ বছর বয়সী মুসলিম যুবক এব্রো আহমেদ। বাসটিতে থাকা ১৯ শিক্ষার্থীকে নিরাপদে রক্ষা করার পেছনে কুরআনের একটি আয়াত তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে আহমেদ বলেন, মানুষের জীবন রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে কুরআনের শিক্ষা তাঁকে এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
সেন্ট পলে পরিবারের মালিকানাধীন ‘ইয়া ব্রিকস স্ন্যাকস অ্যান্ড টোব্যাকো’ নামের একটি দোকানের বাইরে বিরতির সময় ফুটবল খেলছিলেন আহমেদ। এ সময় তাঁর চোখে পড়ে একটি হলুদ স্কুলবাস। বাসটির দরজা খোলা ছিল। চালকের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে দেখে তাঁর সন্দেহ হয়, চালক গুরুতর কোনো শারীরিক সমস্যায় পড়েছেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে বাসটির দিকে দৌড়ে যান তিনি। এরপর চলন্ত বাসে উঠে পড়েন। বাসের সামনের দিকে বসে থাকা দুই ছাত্রীর হাতে নিজের মুঠোফোন ও চশমা দিয়ে দেন, যাতে দুই হাত খালি রেখে বাসটি থামানোর চেষ্টা করতে পারেন।
প্রথমে বাসটিকে পার্কিং গিয়ারে নেওয়ার চেষ্টা করেন আহমেদ। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বাসটি থামানো সহজ হচ্ছিল না। এদিকে বাসের ভেতরে আতঙ্কিত শিশুদের চিৎকার শুনতে পান তিনি। শেষ পর্যন্ত জরুরি ব্রেক প্রয়োগ করে বাসটি থামাতে সক্ষম হন।
এ ঘটনায় বাসের কোনো শিক্ষার্থী কিংবা রাস্তায় থাকা কেউ আহত হননি। বাস থামানোর পর জরুরি সহায়তার জন্য ফোন করতেও শিক্ষার্থীদের একজনকে নির্দেশ দেন তিনি।
বিপদের মুহূর্তে কেন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন, সে ব্যাখ্যায় কুরআনের একটি আয়াতের কথা উল্লেখ করেন আহমেদ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সূরা আল-মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতের শিক্ষা তাঁর মনে পড়েছিল। আয়াতটিতে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
আয়াতটির অর্থের সারমর্ম হলো, যে ব্যক্তি একজন মানুষের প্রাণ রক্ষা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করে।
আহমেদ বলেন, ‘আমি সংখ্যার হিসাব বুঝি, আর এই সংখ্যাগুলো আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়। আমি নিজের জন্য এটা করিনি। সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজটি করেছি।’
আহমেদের সাহসিকতার ঘটনা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর স্কুলবাসে ওঠার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর এই উদ্যোগ প্রশংসা কুড়ায়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কেটিএসপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আহমেদ জানান, চিকিৎসাবিষয়ক জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘গ্রেজ অ্যানাটমি’ থেকেও জরুরি পরিস্থিতিতে শান্ত থাকার বিষয়ে কিছু ধারণা পেয়েছিলেন তিনি।
বাসের ভেতরে আতঙ্কিত শিশুদের দেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। স্কুল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাসেবা কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। অসুস্থ চালককে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
অন্য একটি বাস এসে ১৯ শিক্ষার্থীকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। ঘটনার পরদিন স্কুল কর্তৃপক্ষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দলও শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেয়।
এব্রো আহমেদের এই সাহসিকতার স্বীকৃতিও মিলেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও উদ্যোক্তা শেলেটা ব্রান্ডিজ তাঁকে এক হাজার ডলার অনুদান দেন। এ সময় সুপারম্যানের পোশাক পরা একজন ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। আহমেদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বড় আকারের একটি প্রতীকী চেক।
এ ঘটনার পর বিভিন্ন মহল থেকে অভিনন্দন পেয়েছেন তিনি। একজন সিটি কাউন্সিল সদস্যও তাঁকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান আহমেদ। তাঁর জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। পরিবারের ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযান শুরুর পর তাঁদের দোকানের ব্যবসা কমে গেছে বলে জানান আহমেদ। তবে স্কুলবাসের শিশুদের রক্ষা করার ঘটনায় ইরিত্রীয় ও পূর্ব আফ্রিকান জনগোষ্ঠীকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে তিনি আনন্দিত।
আহমেদের কাছে ঘটনাটি কেবল একটি দুর্ঘটনা এড়ানোর ঘটনা নয়; বরং মানুষের বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও দৃষ্টান্ত। ধর্মীয় বিশ্বাস, মানবিক দায়িত্ববোধ এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস—সব মিলিয়ে তাঁর এই উদ্যোগ ১৯ শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর