এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই গোলাম কিবরিয়াকে নিয়ে যখন তোলপাড়, ঠিক সেদিনই প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে উখিয়া থানায় গিয়ে তাকে নগদ অর্থ পুরস্কার দিলেন কক্সবাজারের বিতর্কিত পুলিশ সুপার (এসপি) এ এন এম সাজেদুর রহমান।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিভিন্ন গণমাধ্যমে ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একই দিন অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের বদলে পুরস্কার দেওয়ার ঘটনায় সমালোচনা করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
পুলিশের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, মাসিক সভায় সর্বোচ্চ মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সদস্যদের পুরস্কৃত করা হয়। কিন্তু সেই রীতির বাইরে গিয়ে অভিযোগ প্রকাশের দিনই উখিয়া থানায় গিয়ে এসআই কিবরিয়ার হাতে নিজে পুরস্কার তুলে দেন এসপি। একই ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও (ওসি) নগদ অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, ২২ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী এলাকায় ছৈয়দুল বশর ওরফে সিসি বশরকে আটক করে পুলিশ। অভিযানে এসআই গোলাম কিবরিয়ার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অংশ নেয়।
অভিযোগকারী ও প্রত্যক্ষদর্শী সরওয়ার সিকদারের দাবি, ওই অভিযানে দেড় লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল, কিন্তু এসআই কিবরিয়াকে বাদী করে দায়ের করা মামলার এজাহারে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দের কথা উল্লেখ রয়েছে, বাকি এক লাখ পিস সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে কিবরিয়ার বিরুদ্ধে। সরওয়ারের আরও অভিযোগ, ওই ইয়াবা পরে এক কোটি ১০ লাখ টাকায় মাদক কারবারিদের কাছে বিক্রি করা হয়, সরওয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিকে প্রথমে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়। পরে তাকে উখিয়া থানায় নেওয়া হয়। এরপর বালুখালীর জোড়াব্রিজ এলাকায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা দুই সাক্ষী দেলোয়ার ও সাদ্দাম জানিয়েছেন, পুলিশের অভিযান ও ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে তারা তেমন কিছু জানেন না। মামলায় সাক্ষী হিসেবে তাদের নাম থাকার বিষয়েও তারা অবগত নন বলে দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে। তাদের মতে, ফুটেজ, জব্দতালিকা, মামলার নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করলে উদ্ধার করা ইয়াবার প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, ২২ অক্টোবর ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার ও একজনকে গ্রেপ্তারের স্বীকৃতি হিসেবেই এসআই কিবরিয়া ও ওসিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তবে একই অভিযানে এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, এসপি স্যার যে এমন ভুল করবেন, সেটা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারিনি। নিয়ম অনুযায়ী, মাসিক সভায় এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তসাপেক্ষ। তবে অভিযোগ প্রকাশের দিনই অভিযুক্ত এসআইকে পুরস্কৃত করার ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, উদ্ধার করা ইয়াবার প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
এসপি সাজেদুর রহমান কক্সবাজারে যোগদানের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনি দিনদুপুরে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে গণডাকাতির ঘটনাও ঘটেছে। এসময় কমপক্ষে অর্ধশত যানবাহন লুট করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের ঠিক সামনেই মিলেছে ইয়াবার গুদাম। সম্প্রতি সেই গুদাম থেকে তিন লাখ পিস ইয়াবাসহ তিন মাদক কারবারিকে আটক করে পুলিশ। কিন্তু অভিযানের সময় সেখান থেকে দুই লাখ পিস ইয়াবা গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে পুরো জেলায় তোলপাড় শুরু হয়। অভিযোগ আছে, ইয়াবা গায়েবকারীকে খুঁজে বের করতেও এসপির কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। শুধু তাই নয়, সাজেদুর রহমান কক্সবাজারে যোগ দেওয়ার পর থেকেই জেলার আইনশৃঙ্খলার বারোটা বেজেছে।
তাদের ভাষ্য, চেয়ারে বসে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেন তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, যোগদানের পর থেকে নানা অপকর্মে জড়িত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের শাস্তির বদলে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন এই পুলিশ সুপার। তার সর্বশেষ প্রমাণ, এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত এসআই কিবরিয়াকে নগদ পুরস্কার।
এসপি যোগদানের পর থেকে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি আদালত প্রাঙ্গণে গোলাগুলি এবং বিচারককে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা, তদন্তের নিরপেক্ষতা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে কক্সবাজারে ৯৫টি খুন, ১২৭টি ধর্ষণ ও ২৯৭টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে দেড় শতাধিক। পর্যটন এলাকাসহ জেলায় প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০টি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে অনেক ঘটনা মামলা বা সাধারণ ডায়েরিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ কঠিন।
গত ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক যুবক পিস্তল দেখিয়ে একজন বিচারককে ভয় দেখান বলে জানিয়েছেন জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক।
তার ভাষ্য, পরে দুই বিচারক তৎকালীন সদর থানার ওসি ছমিউদ্দীনকে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন। বিষয়টি পুলিশ সুপারকেও জানানো হয়েছিল। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর জানুয়ারিতে একাধিক বিচারক পুলিশ সুপারের কাছে গানম্যান চেয়ে চিঠি দেন। অভিযোগ আছে, তাদের নিরাপত্তারক্ষী দেওয়া হয়নি, এমনকি চিঠির জবাবও মেলেনি। এর মধ্যে গত ২৪ মে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন।
গত ২৪ মার্চ রাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম। ঘটনার পর তারিন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। তার ব্যাগ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধারের কথাও জানা যায়। তবে খোরশেদের জানাজা চলাকালে সংবাদ সম্মেলনে তারিনকে নির্দোষ ঘোষণা করেন এসপি। এতে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
খোরশেদের পরিবারের অভিযোগ, এর আগে তাকে হুমকি দিয়েছিলেন তারিন। পরে মামলার বাদী নাওশাদ হোসেন পুলিশের তদন্তে অনাস্থা জানিয়ে আদালতের মাধ্যমে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) স্থানান্তর করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তারিনকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছিল।
গত ২২ এপ্রিল খুরুশকুলে মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধুকে হত্যার পর তার মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন সাংবাদিক অন্তর দে বিশাল। তার অভিযোগ, সংবাদ সরিয়ে না ফেললে তাকে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেন এসপির আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এলআইসি সদস্য সোহেল। সোহেল অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্তর দের দাবি, বিষয়টি এসপিকে জানালে তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, 'আপনাকে নিউজ করতে কে বলছে?' পরে সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে সদর থানা সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করে। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের পাশাপাশি পূজা উদ্যাপন কমিটিও প্রতিবাদ জানায়।
অন্যদিকে, ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক শাহেদ ফেরদৌস হিরুকে এসপি প্রশ্ন করেন, ইয়াবা নিয়ে সাংবাদিকদের এত আগ্রহ কেন? হিরুর অভিযোগ, এসপির ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
জেলা পুলিশের অন্তত ৩৫ জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অভিযোগ, এসপির হঠকারী সিদ্ধান্ত, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বদলি এবং কথায় কথায় বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) ও সার্ভিস বুকে বিরূপ মন্তব্যের ভয় দেখানোর কারণে বাহিনীতে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে ১০১ জন পুলিশ সদস্যকে বদলি করা হয়। তাদের মধ্যে সাতজন পরিদর্শক, ৩৬ জন এসআই, ২৪ জন এএসআই ও ৩৪ জন কনস্টেবল রয়েছেন। কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, অভিজ্ঞ সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ায় স্থানীয় অপরাধপ্রবণ এলাকা সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের জ্ঞান ও অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এমন একজন ব্যক্তি কীভাবে কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হন, তা আমার বোধগম্য নয়। তিনি কক্সবাজারে যোগদানের পর থেকে পুলিশের হেফাজত থেকে ইয়াবা গায়েব হওয়ার ঘটনা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এর পরও তিনি নির্লজ্জের মতো বিতর্কিত কর্মকর্তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন। ‘ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগে জেলাজুড়ে তোলপাড় চলছে। এমন পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে উল্টো তাকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এসপির ন্যূনতম বিবেচনাবোধ থাকলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্তের আগে এমন কাজ করতে পারতেন না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য লজ্জাজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসপির এসব কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, তিনি কক্সবাজারের মানুষের সঙ্গে তামাশা করতে এসেছেন।’
এইসব বিষয়ে জানতে পুলিশ সুপার (এসপি) এ এন এম সাজেদুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হয়। প্রথমে ফোন রিসিভ না করলেও পরে একজন ফোন ধরে বলেন, এসপি স্যার মিটিং এ ব্যস্ত আছে। এরপর তিনি লাইন কেটে দেন। পরে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত না করে উল্টো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য তাকে পাঠানোর অনুরোধ জানান তিনি। একই সঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর