পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির। একই সঙ্গে বক্তব্য প্রত্যাহার করে জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে ছাত্রশিবির।
সোমবার (২৭ অক্টোবর) পৃথক বিবৃতিতে সংগঠন দুটি আইজিপির বক্তব্যের সমালোচনা করে। তাদের মতে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিতবাহী এ ধরনের বক্তব্য সংবিধান, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পরিপন্থি।
আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ জামায়াতের
আইজিপির মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। পুলিশ নাগরিকদের সেবক, শাসক নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান হিসেবে আইজিপির দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা এবং বাকস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছিল। সে সময় বিনা বিচারে হত্যা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে মানুষকে তুলে নিয়ে হত্যা, ক্রসফায়ার ও গুমের মতো ঘটনা ঘটেছে।
জুবায়েরের দাবি, আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যে অতীতের এসব কর্মকাণ্ড পুনরাবৃত্তির হুমকি ও ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের বক্তব্য সংবিধান ও আইনের শাসনের পরিপন্থি। এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জামায়াতের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিএনপির সন্ত্রাসীদের দমন, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং মাদক নির্মূলে ব্যর্থতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অদক্ষতার পরিচায়ক। নাগরিকদের জীবনযাত্রা স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ করতে বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি শিবিরের
অন্যদিকে, সরকারের অনুমতি পেলে প্রয়োজনে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে—আইজিপির এমন বক্তব্য প্রত্যাহার করে জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির।
সোমবার সংগঠনটির সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রকাশ্য ঘোষণা সংবিধান, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ওপর গুরুতর আঘাত। অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা বাহিনীর প্রধান যখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন, তখন তা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও আইনের শাসনের জন্য হুমকি তৈরি করে।
শিবির নেতারা আরও বলেন, সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের আইনি সুরক্ষা, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। এসব অধিকার উপেক্ষা করে কোনো ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার পুলিশের নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিরও সমালোচনা করেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, ওই বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা উদ্বেগজনক এবং ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
শিবির নেতারা বলেন, কে অপরাধী এবং তাঁর কী শাস্তি হবে, তা নির্ধারণ করার এখতিয়ার আদালতের। পুলিশের দায়িত্ব অপরাধ তদন্ত করা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করা।
কী বলেছিলেন আইজিপি?
এর আগে সোমবার সকালে রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের চকবাজার ইসলামিক ব্যাংকিং শাখার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির।
সেখানে তিনি বলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার প্রয়োজন হয়, সরকার যদি এলাউ করে, তাহলে আমরা সেটাই করব।’
আইজিপির এ বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর
আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।
সংস্থাটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইজিপি তাঁর বক্তব্যে মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের দৃঢ় অঙ্গীকার তুলে ধরেছেন।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেছেন।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের এই ব্যাখ্যার পরও আইজিপির বক্তব্য নিয়ে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের আপত্তি অব্যাহত রয়েছে। সংগঠন দুটি এ ধরনের বক্তব্যের পরিবর্তে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অপরাধ দমন এবং নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর