দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলগুলোর জয়জয়কার অবস্থা হলেও ডুবেছে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলগুলো। শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় জয়ের কৌশলগুলো আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে কতটুকু কাজে আসতে পারে?
ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন শুরু হয়েছিল গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) দিয়ে। ডাকসুতে ২৮ পদের মধ্যে শিবির সমর্থিত প্যানেল ২৩ পদে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৪ পদে ও হেমা চাকমার (প্রতিরোধ পর্ষদ) ১ টি পদে জয় পেলেও ছাত্রদলের প্রার্থীরা কোন পদেই জয় পাননি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচনী ফলাফলের দিকে এক নজরে আলোকপাত করা যাক---

শিবির সমর্থিত প্যানেলগুলো মোট ৮৩.৭% পদে বিজিত হয়েছে যেটা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। যেখানে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীদের ভোটের এত বড় নমুনা ও বিএনপির মত বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন সেখানে এমন একপাক্ষিক জয় বিস্মিত করার মত। জয়-পরাজয় থাকবে, কিন্তু বিজিত ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে প্রাপ্ত আসন সংখ্যার পার্থক্য যখন অসাধারণভাবে পরিলক্ষিত হয়, তখন সেখানে কিছু পুশ-পুল ফ্যাক্টর বা অদৃশ্য খেলা থাকার সম্ভাবনা থাকে।
এই অদৃশ্য খেলাগুলো বুঝতে হলে ছাত্র সংসদের ভোট কি কি কারণে প্রভাবিত হতে পারে সেগুলো বুঝাটা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসাবে যতটুকু দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো চিরকালই সরকার সমর্থিত শিক্ষার্থীরা নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ভিসির মত উচ্চপদস্থ পদগুলোও পান সরকার সমর্থিত কর্মকর্তারা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী হলে থাকেন এবং তারাই অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করেন। আবার, হলের শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করেন সরকার সমর্থিত শিক্ষার্থীরা এবং বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠনের (যেমন রক্তদানের জন্য বাঁধন) শিক্ষার্থীরা।
প্রতিটি হলেই সরকার সমর্থিত শিক্ষার্থীদের গ্রুপ ও হলের ডাইনিং-ক্যন্টিন, লাইব্রেরি, খেলাধুলা ও রক্তদানের মত বিষয়গুলোর কমিটিগুলোতে যারা থাকেন তারাই মূলত ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচনে জয়- পরাজয়ের মূল নায়ক। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে প্রতিটি হলেই বিভিন্ন বিষয়ের উপরে প্রায় ৫-৭ টিকমিটি থাকে এবং প্রতিটি কমিটিতে গড়ে প্রায় ১০-২০ জন সদস্য থাকে।
একটা ঝাঁকে ৫০০০ মাছ থাকলেও প্রথম সারির ৫০টি মাছই যেভাবে সবগুলোর গন্তব্য ঠিক করে, তেমনি একটা হলে বিভিন্ন বিষয়ে নেতৃত্বদানকারী কিছু শিক্ষার্থী ভোটের জন্য যে দিকে কণ্ঠস্বর তোলে বাকি সবাই সাধারানত সেদিকেই গড়ে পড়েন।
ছাত্রদলের কিছু শিক্ষার্থীর দাবি শিবির হলের নেতৃস্থানীয় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন উপায়ে, যেমন কাউকে ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে, কাউকে থাকা-খাওয়ার সুবিধা দিয়ে, কাউকে নগদ টাকা দিয়ে, কাউকে বিভিন্ন উপহার
সামগ্রী (ল্যাপটপ ও মোবাইল) দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছে। এসব কাজে তাদের ছিল প্রচুর অর্থ বরাদ্দ যেটা সরবরাহ করা হয়েছে জামায়াতের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এমনকি পাকিস্থান ও তুরস্কের কিছু মাধ্যম থেকেও। এসব দাবির সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত তথ্য না থাকলেও গত কয়েক দিনে জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় জামায়াতের নেতাকর্মীরা যেভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাতীয় পরিচয় পত্রের নাম্বার ও বিকাশ নাম্বার চাচ্ছেন তাতে এসব দাবি যথেষ্ট শক্তিশালী বলে মনে হয়।
যেভাবেই হোক না কেন শিবির জিতেছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ছাত্রদল কেন পারল না? তাদের হারের কারণ নিয়ে নানা মহলে বিবিধ আলোচনা থাকলেও নিম্নলিখিত কারণগুলো বেশি যৌক্তিক বলে মনে হয়-
প্রথমত, ছাত্রদলের কোন শিক্ষার্থীই বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকতে পারে নাই। উপরন্ত, নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণেও নানা কায়দায় বাধা দেয়া হয়েছে। দু-চারটি জায়গায় তাদের কমিটি থাকলেও হাজারো মামলা হামলায় প্রায় সবার জীবন ছিল অতিষ্ঠ অথচ,বর্তমানের ছাত্রশিবিরের নেতারা ঐ সময়ে গুপ্ত অবস্থায় ছত্রলীগের সাথে মিলেমিশে হলে ছিলেন। শেখ হাসিনার বিদায়ের পরে ছাত্রলীগের একটা অংশ হল ছাড়লেও আরেকটা বড় অংশ তাদের পুরানো গুপ্ত (এখন
শিবির নেতা) বন্ধুদের সাথে হলেই থেকেছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে। সুতরাং শিবির সহজেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে পেরেছে, যার ফলাফলও তারা ভোটের মাঠে পেয়েছে। অপরদিকে, বিভিন্ন জটিলতার কারণে ছন্নছাড়া ছাত্রদল এখনও নিজেরাই হলে গুছিয়ে উঠতে পারেনি।
দ্বিতীয়ত, শিবির নামে-বেনামে বা ছদ্মনামে হল ও ক্যাম্পাসগুলোর বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত। এই সংগঠনগুলো সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ভাষায় কথা বলে তাদের ভোটকে প্রভাবিত করেছে। আবার, এনসিপিকে প্রথম থেকেই অনেকে জামায়াতের বিটিম মনে করলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচনে সেই ধারণা আরও পোক্ত হয়েছে কারণ যাদের নেতৃত্বে শেখ হাসিনার বিদায় ঘন্টা বাজল সেই তেজ্বসী ছাত্র নেতাদের ভোট কোথায় গেল? মাত্র এক বছরেই কি তাদের ভোট হাওয়া হয়ে গেল? নাকি তাদের অনেক ভোট শিবিরের বাক্সে জমা হয়েছে! জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের সাথে এনসিপির জোটভুক্ত হওয়া ও অনেকের দল ছাড়ার ঘোষণায়, এই ধারনা আরও স্পষ্ট হয়েছে যে এনসিপি হয়ত জামায়াতের বিটিম।
তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার বিদায়ের পরে থেকেই শিবির আটঘাট বেঁধে নেমেছিল যেকোন মূল্যে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রন লাগবে এবং সেই জন্য তারা স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছিল। অপরদিকে, বিএনপি ও ছাত্রদলের কোন নির্বাচনী পরিকল্পনাই ছিল না। তাদের একটা অংশ যারা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে দেশ গড়তে চায় তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য সরকারকে বিভিন্ন কৌশলে চাপ দিতে থাকে। পক্ষান্তরে, আরেকটা অংশ যারা রাজনৈতিক পেটুক তারা চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। এই গ্রুপের কুকর্মগুলো শিবির তাদের ফেসবুকের বট আইডিসহ বিভিন্ন সোসাল মিডিয়াতে এমনভাবে প্রচার-প্রসার করেছে, যাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিএনপি তথা ছাত্রদলের প্রতি অতি খারাপ ধারণা পোষণ করে।
চতুর্থত, স্মার্টফোন ও সোসাল মিডিয়ার এই যুগে প্রচারণার একটা বড় অংশ দখল করেছে অনলাইন ভিত্তিক কার্যক্রম। এসব অনলাইন ভিত্তিক কার্যক্রমে ছাত্রদল শিবিরের থেকে অনেক পিছিয়ে। এই পিছিয়ে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ হল ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অর্থ সঙ্কট। বিভিন্ন অনলাইন ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করা, বিতর্ক প্রতিযোগিতাসহ শিক্ষার্থীদের চাহিদামত নানাবিধ কর্মসূচির আয়োজন করা ও হলের ভিতরে নানান কাজে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম এমন শিক্ষার্থীদের ব্যক্তগত চাহিদা মেটানোর মত কাজেগুলোতে শিবিরের আর্থিক সামর্থ্য ছিল ছত্রদলের চেয়ে অনেক বেশি।
পঞ্চম, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। ডাকসু নির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিন সকাল ১০.১৮ মিনিটে “নিয়ম ভেঙ্গে ভোট কেন্দ্রে ঢুকলেন ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদ” এই শিরনামে খবর প্রকাশ করেছিল যায়যায়দিন। কিন্তু বিকাল ৪.২৮ মিনিটে আবার “ভুল বলেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা, নিয়ম ভাঙেননি ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল” এই শিরনামে প্রথমআলো খবর প্রকাশ করেছিল। কিন্তু এতক্ষণে ভোট দেয়া প্রায় শেষ। ভোটের মূল স্রোতের সময়ে কেন একজন রিটার্নিং কর্মকর্তা এমন খবর ছড়ালেন? এটা নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত ছিল। সবগুলো নির্বাচনেই এমন কিছু খবর গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ইঙ্গিত বহন করে।
যাইহোক, আগামীতে জয় পেতে হলে ছাত্রদলের উচিত নিম্নলিখিত কাজগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া- প্রথমত, বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও বিনোদনমূলক কর্মসূচির আয়োজন করা। দ্বিতীয়ত, কমিটি দেয়ার সময় নিয়মিত ছাত্র, সিজিপিএ ও পুনরায় ভর্তি এই বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল করে প্রার্থী যাচাই করা। তৃতীয়ত, নিজেদের ভুলগুলো স্বীকার করে অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া। চতুর্থত, অনলাইন ও সোসাল মিডিয়া ভিত্তিক প্রচার মাধ্যমগুলো শক্তিশালী করা, পঞ্চম ছাত্রদলকে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজের জন্য যথেষ্ট অর্থ সরবারহ করা, পরামর্শ দেয়া ও কাজের তদারকি করা। ষষ্ঠ, শিবিরের মওদুদী আকিদাগত সমস্যা, ধর্মীয় অপব্যাখ্যার কূটকৌশল ও হাদিয়া বা বায়তুল মালের নামে চাঁদাবাজির মত বিষয়গুলো রুখে দিতে হক্কানী আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদদের সাথে নিয়ে কাজ করা।
পরিশেষে বলা যায়, শিবির যেভাবেই জিতুক না কেন? জয়ের মালা এখন তাদের গলায়। প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় জয়ের এই কৌশলগুলো কি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে কাজে আসবে? মনে হয় না। কারণ, প্রথমত, পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদগুলোতে যে ভোটার সংখ্যা ছিল, তা জাতীয় নির্বাচনে একটা আসনের ভোটার সংখ্যার চেয়েও কম। কূটকৌশল করে অল্প কিছু মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও গণমানুষকে করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, তাদের কূটকৌশল ও ধর্ম ব্যবসা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছে। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচন নিয়ে বিএনপি ও ছাত্রদলের কোন পরিকল্পনাই ছিল না। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন যেহেতু ক্ষমতার ভারকেন্দ্র সেহেতু পরিকল্পনা, টাকা ও জনবল নিয়ে তারা বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
লেখক: মেহেদী হাসান মানিক
শিক্ষা সম্পাদক, হিউম্যান এইড এন্ড ট্রাস্ট ইন্টারন্যাশনাল
সিনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক, এসিআই ফার্মা
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
খোলা কলাম এর সর্বশেষ খবর