মাসউদুর রহমান, নেপাল থেকে ফিরে: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে হিমালয় কন্যা নামে খ্যাত নেপাল এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তরুণ প্রজন্মের ‘জেন জি’আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সমীকরণ ওলটপালট হয়ে যাওয়ার পর, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশটির রাজনীতিতে বইছে নতুন পরিবর্তনের হাওয়া। আগামী ৫ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে নেপালের আকাশ-বাতাস এখন নির্বাচনী আমেজে মুখরিত। তবে এর পেছনে রয়ে গেছে এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস ও গভীর অনিশ্চয়তা।
২০২৫ সালের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর নেপালের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করা, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে কেঁপে ওঠে কাঠমান্ডু। সেই আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন প্রাণ হারান। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি।
পরবর্তীতে ১২ সেপ্টেম্বর সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি-র নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্যই হলো ৫ মার্চের নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করা এবং দেশের ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করা।
জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে নেপালের রাজনৈতিক চিত্রটি বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে। পুরোনো রাজনৈতিক দলের সংকট। নেপালের সবচেয়ে পুরোনো দল নেপালি কংগ্রেস এখন গভীর সংকটে। দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে ফাটল ধরেছে। একদল নেতা তরুণ প্রজন্মান্তরের দাবি তুলছেন, অন্যদল প্রবীণ নেতৃত্বের ওপর ভরসা রাখছেন। অন্যদিকে, ওলি নেতৃত্বাধীন ইউএমএল (UML) নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলে আসছে।
নেপালের রাজনীতিতে এবারের সবচেয়ে বড় চমক হয়ে দাঁড়িয়েছেন কাঠমান্ডুর সদ্য পদত্যাগী মেয়র ও জনপ্রিয় র্যাপার বালেন শাহ। তরুণদের আইকন হিসেবে পরিচিত বালেন শাহ সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়ে পুরোনো দলগুলোর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে ১৯ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে। ১০ জানুয়ারির পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের চূড়ান্ত ইশতেহার ও প্রার্থী তালিকা গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছে।
এদিকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি সম্প্রতি একাধিক বক্তব্যে নেপালের স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছেন। গত ১১ জানুয়ারি কাঠমান্ডুর এক অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "নেপালকে কোনোভাবেই অস্থিতিশীলতার পথে হাঁটতে দেওয়া হবে না।" তবে জেন-জি আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে নিয়মিত চাপ এবং পুরোনো দলগুলোর অসহযোগিতা তার প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অভ্যুত্থানের সময়কার সহিংসতা ও অস্ত্র লুটের পর দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্নীপরীক্ষা।
নেপালের এই অস্থির পরিস্থিতিতে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর কড়া নজর রয়েছে। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় থাকা দেশগুলো চায় নেপালে একটি স্থিতিশীল কিন্তু মিত্র ভাবাপন্ন সরকার আসুক। বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধারও এই নির্বাচনের সফলতার ওপর নির্ভর করছে।
নেপাল এখন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। একদিকে পুরোনো দলগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। ৫ মার্চের নির্বাচন কি পারবে হিমালয় কন্যার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করতে? নাকি এটি নতুন কোনো সঙ্কটের সূচনা করবে? উত্তর এখন নেপালি জনগণের ভোটের বাক্সে বন্দি। তবে আপাতত, কাঠমান্ডুর রাজপথ থেকে শুরু করে তরাইয়ের সমভূমি—সবখানেই ধ্বনিত হচ্ছে নতুন নেপাল গড়ার ডাক।
মাসউদুর রহমান
লেখক ও সাংবাদিক
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর