তাজবীর সজীব, শিক্ষক ও সাংবাদিক : অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম, এবারের নির্বাচন নিয়ে একটি কলাম লিখব। পরিকল্পনা ছিল ১২ ফেব্রুয়ারি একটি বিশদ বিশ্লেষণ প্রকাশ করব। তারও আগে, ১০ তারিখে রাজনৈতিক সমীকরণ মিলিয়ে একটি সম্ভাব্য পূর্বাভাস দেব—কে যেতে পারে ক্ষমতায়, কোন জোট কতদূর এগোবে। কিন্তু মানুষের পরিকল্পনার ওপরে যে ভাগ্যের পরিকল্পনা থাকে, সেটাই শেষ কথা। ৮ তারিখে হঠাৎ আমার সার্জারি। এখন পোস্ট-অপারেশন বিশ্রামে আছি।
দীর্ঘ বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান, আসনভিত্তিক হিসাব—এসব করার মতো অবস্থায় নেই। মোট কথা এত লেখার এনার্জি নেই আমার হাতে।
রাত পোহালেই নির্বাচন। তাই মোবাইল ফোনে শুয়ে শুয়েই এই কলাম লিখছি—একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে, একজন দীর্ঘদিনের সাংবাদিক হিসেবে, আর একজন নাগরিক হিসেবে।
১৭ বছর পর বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছে। এই একটি বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সময়ের ভার। গত ১৭ বছরে যারা ভোটার ছিলেন, তাদের অনেকেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। আবার এই দীর্ঘ সময়ে যারা নতুন ভোটার হয়েছেন, তাদের বড় একটি অংশ জানেই না ভোটের স্বাদ কেমন। ভোট কেবল একটি ব্যালট পেপার নয়; এটি রাষ্ট্র বদলের চাবিকাঠি। নাগরিকের হাতে থাকা সাংবিধানিক ক্ষমতা। আগামীকাল, যদি ভোট নিরপেক্ষ হয়, তবে বহু মানুষ প্রথমবার উপলব্ধি করবে—সরকার গঠন কিংবা অপসারণের ক্ষমতা তাদের হাতেই।
আমি ‘যদি’ বলছি কেন? কারণ নির্বাচনের আগে নানা মহলে শোনা গেছে—নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে, প্রভাব খাটানো হতে পারে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এবার নাগরিক তার ভোট দেওয়ার মর্যাদা পাবে। সেই বিশ্বাস পুরোপুরি তথ্যনির্ভর নয়, বরং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে একটি অনুভূতি।
আমি বিশদ বিশ্লেষণের অবস্থায় নেই—এ কথা আগেই বলেছি। তাই আসনভিত্তিক জটিল অঙ্ক নয়, মোটাদাগে একটি রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরছি, দীর্ঘ সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ থেকে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা, সহজ করে বললে খালি চোখে এ দলটি অদৃশ্য। অনেকেই মনে করেছিলেন, আওয়ামী লীগ না থাকলে বিএনপি একতরফাভাবে বিপুল আসন পাবে। কিন্তু সেই সহজ সমীকরণকে চ্যালেঞ্জ করেছে জামায়াতে ইসলামী। নানা কৌশলে তারা নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে, মাঠে নেমেছে বহুমুখী প্রচারণায়।
বিশেষ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলা কর্মীদের প্রচারণা, ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করার অভিযোগ—এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে। দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে ‘জান্নাত’, না দিলে ‘কবরে জবাব’—এমন বক্তব্যের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে, যদিও শীর্ষ নেতারা তা অস্বীকার করেছেন। ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার—বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়, তবে এবারের নির্বাচনে তা বিশেষভাবে দৃশ্যমান।
ইতিহাস বলছে, জামায়াতের সর্বোচ্চ সাফল্য ১৯৯১ সালে—১৮টি আসন। ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট করে ১৭টি আসন। এবার প্রশ্ন হচ্ছে—বড় দল ছাড়া, ছোট দশটি দল নিয়ে জোট করে তারা কতদূর যেতে পারবে?
অনেকের ধারণা, তারা হয়তো ২০টির মতো আসন পেতে পারে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন একটু ভিন্ন। মাঠপর্যায়ের প্রচারণা, ভোটের সমীকরণ এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট শূন্যতার কিছু অংশ তারা পূরণ করতে পারলে, জামায়াত-জোট ৫০-এর আশপাশে আসন পেতেও পারে—এ সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে বিএনপি—তাদের সামনে সুযোগ বড়। সংগঠন, জনসমর্থন এবং দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনীতির পুঁজি মিলিয়ে তারা সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পেতে পারে বলেই আমার ধারণা। পাশাপাশি কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী, বিশেষ করে বিদ্রোহী বিএনপি ঘরানার প্রার্থীরাও জয়ী হতে পারেন।
তাহলে কি অঙ্ক খুব সহজ? বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, জামায়াত-জোট উল্লেখযোগ্য আসন পাবে, কিছু স্বতন্ত্র যুক্ত হবে—বিএনপির সরকার গঠন হয়ে যাবে? আমার তো আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে।
তবে ক্ষমতায় যাওয়া এক বিষয়, দেশ পরিচালনা আরেক বিষয়। জোটের ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, প্রশাসনিক পুনর্গঠন—সব মিলিয়ে সামনে কঠিন পথ। তবে আমার বিশ্বাস, বিএনপি চেয়ারপারসন ও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সেই কঠিন দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই এগোবেন। কারণ ক্ষমতার মসনদে বিএনপি আসীন হচ্ছে—এটা হলফ করে না হলেও আমার অন্তর্দৃষ্টি সেটাই বলছে।
শেষ কথা হলো—সব জল্পনা, সব বিশ্লেষণ, সব পূর্বাভাসের চূড়ান্ত বিচারক একজনই: ভোটার। রাত পোহালেই বোঝা যাবে কার গাড়ি কতদূর গেল, কার হিসাব মিলল, আর কার স্বপ্ন অপূর্ণ রইল।
আমি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকতে চাই। গণতন্ত্রের শক্তি জনগণের হাতে ফিরে আসুক—এই কামনা করি।
আগাম শুভেচ্ছা রইল বিএনপির জন্য—যদি তারা জনতার রায়ে ক্ষমতার মসনদে বসে, তবে সেই রায়ের মর্যাদা রক্ষা করাই হবে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এখন অপেক্ষা শুধু ভোরের। তারপরই জানা যাবে—জনতার রায় কোন দিকে।
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সর্বশেষ খবর