বরিশাল নগরীর প্রায় সবকটি পেট্রোল পাম্পে এখন ঝুলছে ‘অকটেন নেই’ লেখা সাইনবোর্ড। দু-একটি পাম্পে তেল পাওয়া গেলেও সেখানে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ সারি। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তাপকে পুঁজি করে বরিশালের জ্বালানি বাজারে তৈরি করা হয়েছে এক ভয়াবহ অস্থিরতা। তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র—যুগান্তকারী এই সংকটের নেপথ্যে বিশ্বরাজনীতির চেয়ে স্থানীয় ‘পাম্প সিন্ডিকেট’ এবং ‘প্যানিক বায়িং’ (আতঙ্কে অতিরিক্ত ক্রয়) বেশি দায়ী।
নগরীর নথুল্লাবাদ, রূপাতলী এবং বান্দ রোড এলাকার পাম্পগুলো ঘুরে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকদের হাহাকার। পাম্প মালিকদের দাবি, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে সরবরাহ কমেছে।
বরিশালের একটি পাম্পের ম্যানেজার বলেন, ডিপো থেকে আমাদের চাহিদামত অকটেন দেওয়া হচ্ছে না। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বন্ধ, তাই সরকারও তেল দিতে পারছে না। আমাদের কাছে যা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে।
অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেল যদিও পাম্প মালিকরা যুদ্ধের দোহাই দিচ্ছেন, কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। সরকারি হিসেবে দেশে এখনো অন্তত ১৫-২০ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। তাহলে বরিশালে কেন হুট করে অকটেন উধাও?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক পাম্প মালিক ডিপো থেকে তেল নিলেও তা আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাংকে জমিয়ে রাখছেন। দাম বাড়ার আশায় তারা এই ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি করেছেন যাতে বেশি দামে কালোবাজারে তেল বিক্রি করা যায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুদ্ধের গুজবে সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত হয়ে ফুল ট্যাংক তেল নিচ্ছেন। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে একটি পাম্পে দৈনিক ২,০০০ লিটার অকটেন বিক্রি হতো, সেখানে এখন চাহিদা বেড়ে ৫,০০০ লিটারে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় ইতোমধ্যে সরকার 'রেশনিং' বা তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
বরিশালের জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই জ্বালানী সিন্ডিকেট বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব আমাদের আমদানিতে এখনো সরাসরি পড়েনি। আমাদের পর্যাপ্ত মজুত আছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী যুদ্ধের কথা বলে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছে। আমরা পাম্পগুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা শুরু করছি।
ভুক্তভোগী এক মোটরসাইকেল চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত তিনদিন ধরে পাম্পে পাম্পে ঘুরছি। তারা বলছে তেল নেই, কিন্তু তেলের লরি ঠিকই পাম্পে ঢুকতে দেখছি। এটা যুদ্ধের চেয়ে বড় চুরির সিন্ডিকেট।
বরিশাল নগরীতে চলমান অকটেন সংকটটি বৈশ্বিক পরিস্থিতির চেয়ে স্থানীয় সিন্ডিকেটের কারসাজি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রশাসন যদি কঠোরভাবে মজুত পরীক্ষা না করে, তবে এই সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর