সকালে অফিসে বসা, দুপুরে বসে খাওয়া, বিকেলে আবার কম্পিউটারের সামনে দীর্ঘক্ষণ কাজ—দিনের বড় একটা সময় চেয়ারে কাটছে অনেকেরই। কাজের প্রয়োজনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এখন আধুনিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু দিনের পর দিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা, পুষ্টির ঘাটতি এবং কিছু অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে হাড় ও পেশির স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিক। বিশেষ করে বয়স বাড়ার পর অস্টিয়োপোরোসিসের মতো সমস্যায় হাড় ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। তবে হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষার প্রস্তুতি শুধু বার্ধক্যে পৌঁছানোর পর শুরু করলে হবে না। ছোটবেলা ও প্রাপ্তবয়স্ক বয়স থেকেই সঠিক খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হাড়ের শক্তি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখন থেকেই কোন অভ্যাসগুলো বদলানো দরকার, তা জেনে রাখা ভালো।
১. দিনের বেশির ভাগ সময় বসে থাকা
অফিসে টানা কয়েক ঘণ্টা বসে কাজ করা, লিফট ব্যবহার করা, হাঁটার বদলে গাড়ি নেওয়া—সব মিলিয়ে দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা কমে গেলে হাড় ও পেশির ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। হাড় জীবন্ত টিস্যু। শরীরের ওপর উপযুক্ত পরিমাণে চাপ ও শারীরিক কার্যকলাপ হাড়কে শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে। তাই নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার, হালকা জগিং বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম দৈনন্দিন রুটিনে রাখা উপকারী। অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করলে মাঝেমধ্যে উঠে কয়েক মিনিট হাঁটাহাঁটি করা, অবস্থান পরিবর্তন করা এবং সম্ভব হলে দিনের মধ্যে কিছুটা সময় শারীরিক কর্মকাণ্ডের জন্য রাখা ভালো অভ্যাস।

২. ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি-কে অবহেলা করা
হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা উঠলেই ক্যালশিয়ামের কথা আসে। হাড় ও দাঁতের গঠনে ক্যালশিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর শরীরে ক্যালশিয়াম শোষণের জন্য ভিটামিন ডি প্রয়োজনীয়। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ছোট মাছ, কিছু শাকসবজি, ডাল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার থেকে ক্যালশিয়াম পাওয়া যায়। ভিটামিন ডি-এর অন্যতম উৎস সূর্যালোক; পাশাপাশি কিছু খাবারেও এটি পাওয়া যায়। তবে সবার চাহিদা এক নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণ অনুযায়ী প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। তাই প্রয়োজন না জেনে নিজের ইচ্ছায় ক্যালশিয়াম বা ভিটামিন ডি-এর সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহলের অভ্যাস
হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ধূমপান মোটেই ভালো অভ্যাস নয়। দীর্ঘদিন ধূমপানের সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণও হাড়ের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি শরীরের পুষ্টি গ্রহণ ও হাড়ের স্বাভাবিক বিপাকপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এবং পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই হাড়ের পাশাপাশি সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ধূমপান এড়ানো এবং অ্যালকোহল গ্রহণে সংযমী হওয়া জরুরি।
৪. অতিরিক্ত নুন, চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
খাবারে অতিরিক্ত নুন ও চিনি শুধু হাড়ের জন্য নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো নয়। বিশেষ করে নিয়মিত ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত খাবার, অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—নুন বা চিনি খেলেই সরাসরি হাড় ক্ষয়ে যায়, এমন সরল সম্পর্ক টানা ঠিক নয়। বরং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের কারণে খাদ্যতালিকা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার বাদ পড়ে যেতে পারে। তাই খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য, পর্যাপ্ত প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির মতো পুষ্টিকর উপাদানের জায়গা বাড়ানো ভালো।
৫. খুব কম খাওয়া বা অতিরিক্ত কড়া ডায়েট
ওজন কমানোর তাড়ায় অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম খাবার খান। দীর্ঘদিন এমন করলে শরীর পর্যাপ্ত ক্যালশিয়াম, প্রোটিন, ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বিশেষ করে শরীরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে হাড়ের ঘনত্ব কমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অতিরিক্ত কড়া ডায়েটের বদলে বয়স, উচ্চতা, ওজন ও শারীরিক প্রয়োজন অনুযায়ী ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খাওয়াই ভালো। ওজন কমানোর প্রয়োজন থাকলে দ্রুত ফল পাওয়ার জন্য না খেয়ে থাকার বদলে পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শে স্বাস্থ্যকর পরিকল্পনা তৈরি করা নিরাপদ।
হাড়ের স্বাস্থ্য শুধু পাঁচটি অভ্যাস বদলানোর ওপর নির্ভর করে না। সার্বিক জীবনযাপনের কয়েকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত শরীরচর্চা: হাঁটা, সিঁড়ি ওঠা, নাচ, জগিং এবং শক্তিবর্ধক ব্যায়াম হাড় ও পেশির জন্য উপকারী হতে পারে। তবে ব্যায়াম শুরু করার আগে নিজের বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি।
পর্যাপ্ত প্রোটিন: পেশি ভালো থাকলে শরীরের ভারসাম্য ও চলাফেরাও ভালো থাকে। ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ডাল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন উৎস থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা: অতিরিক্ত ওজন যেমন হাঁটু ও অন্যান্য জয়েন্টের ওপর চাপ বাড়াতে পারে, তেমনই অস্বাভাবিক কম ওজনও হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম: শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ।
পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো: বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড় দুর্বল হলে সামান্য পড়ে গিয়েও গুরুতর চোট লাগতে পারে। তাই বাড়িতে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ চলাচলের জায়গা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই হাঁটুতে ব্যথা হলেই ধরে নেন, হাড় দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হাঁটুর ব্যথার পেছনে অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস, পেশি বা লিগামেন্টের সমস্যা, অতিরিক্ত ওজন, পুরোনো আঘাতসহ নানা কারণ থাকতে পারে। একইভাবে অস্টিয়োপোরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো ব্যথা বা স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। তাই দীর্ঘদিনের ব্যথা, বারবার হাড় ভেঙে যাওয়া, উচ্চতা কমে যাওয়া বা পিঠের আকৃতিতে পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বৃদ্ধ বয়সে হাড়ের সমস্যা এড়ানোর সবচেয়ে ভালো সময় হলো তার অনেক আগেই। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস কমানো, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, ধূমপান এড়ানো এবং অযথা কড়া ডায়েট না করা—এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো দীর্ঘমেয়াদে হাড় ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই ভবিষ্যতে শক্তিশালী হাড়, সচল শরীর এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
লাইফ স্টাইল এর সর্বশেষ খবর