রাতে ঘুমাতে গেলেই মশার উৎপাত। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায়, একই ঘরে কয়েকজন মানুষ থাকলেও মশা যেন কাউকে বেশি পছন্দ করে, কাউকে কম। একজনের শরীরে একের পর এক মশা বসছে, অথচ পাশের মানুষটি প্রায় নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছেন।
প্রশ্ন হলো—মশা কি সত্যিই কিছু মানুষকে বেশি পছন্দ করে? আর মানুষের শরীরের কোন গন্ধ তাদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে?
বিজ্ঞান বলছে, হ্যাঁ। মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া গন্ধ, নিঃশ্বাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড, শরীরের তাপমাত্রা ও ত্বকের রাসায়নিক উপাদানের পার্থক্যের কারণে একজন মানুষ অন্যজনের তুলনায় মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারেন।
মশা কীভাবে মানুষ খুঁজে নেয়?
মশার কাছে মানুষকে খুঁজে পাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হলো কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂)।
আমরা যখন শ্বাস ছাড়ি, তখন বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়। মশা দূর থেকেই এই সংকেত শনাক্ত করে মানুষের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। এরপর কাছে এলে শরীরের গন্ধ, তাপ ও অন্যান্য সংকেত ব্যবহার করে লক্ষ্য নির্ধারণ করে। অর্থাৎ অন্ধকার ঘরেও মশা আপনাকে খুঁজে পেতে পারে—শুধু চোখ দিয়ে নয়, আপনার নিঃশ্বাস ও শরীরের রাসায়নিক সংকেত অনুসরণ করে।

কোন গন্ধে মশা বেশি আকৃষ্ট হয়?
এখানেই সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়।
মানুষের শরীর থেকে শত শত ধরনের উদ্বায়ী রাসায়নিক পদার্থ বের হয়। ত্বকের ওপর থাকা ব্যাকটেরিয়াও ঘামের বিভিন্ন উপাদান ভেঙে নানা ধরনের গন্ধ তৈরি করে। এই গন্ধের রাসায়নিক গঠন একেক মানুষের ক্ষেত্রে একেক রকম।
গবেষণায় দেখা গেছে, ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া এবং বিভিন্ন কার্বক্সিলিক অ্যাসিড মশার আকর্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে এসব গন্ধের সমন্বয় মশাকে মানুষের দিকে টেনে আনতে পারে।
২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব মানুষের ত্বক থেকে তুলনামূলক বেশি কার্বক্সিলিক অ্যাসিড নির্গত হয়, তারা মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারেন।
ত্বকের ব্যাকটেরিয়াও কি দায়ী?
আমাদের ত্বকে অসংখ্য অণুজীব বা skin microbiome বসবাস করে। এগুলো ঘাম ও ত্বকের অন্যান্য উপাদান ভেঙে এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি করতে পারে, যার গন্ধ মশাকে আকৃষ্ট করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ত্বকের মাইক্রোবায়োমের গঠন একরকম, তাদের মশার প্রতি আকর্ষণও একই রকম নাও হতে পারে। অর্থাৎ মশা শুধু মানুষের গন্ধ নেয় না—ত্বকে বসবাসকারী অণুজীবের তৈরি রাসায়নিক সংকেতও ‘পড়তে’ পারে।
তাহলে ঘামলেই কি মশা বেশি কামড়াবে?
তাহলে ঘামলেই কি মশা বেশি কামড়াবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। ঘাম নিজে একমাত্র কারণ নয়। ঘামের উপাদান, ত্বকের ব্যাকটেরিয়া, শরীরের তাপমাত্রা, নিঃশ্বাসের CO₂ এবং অন্যান্য রাসায়নিক সংকেত একসঙ্গে মশার আচরণকে প্রভাবিত করে। এ কারণেই “ঘামলেই মশা বেশি কামড়ায়”—এমন সরল সিদ্ধান্তের চেয়ে বলা ভালো, ঘাম ও ত্বকের রাসায়নিক পরিবর্তন মশার আকর্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।
শরীরের তাপও মশার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, মশা শুধু গন্ধ অনুসরণ করে না। শরীরের তাপ ও আর্দ্রতাও কাছাকাছি এসে মানুষ শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, CO₂ ও গন্ধের সংকেতের সঙ্গে তাপের সংকেত মিলিয়ে মশা মানুষের দিকে এগোয়। ফলে একজন মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া একাধিক সংকেত একসঙ্গে মশার জন্য একটি ‘ঠিকানা’ তৈরি করে।
নতুন গবেষণায় আরও চমক
২০২৬ সালের একটি গবেষণায় তিন প্রজাতির মশা—Aedes aegypti, Aedes albopictus এবং Culex quinquefasciatus—মানুষের প্রতি আকর্ষণের পার্থক্য পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণাটিতে দেখা যায়, মশার প্রজাতি ভেদে মানুষ পছন্দ করার ধরনও আলাদা হতে পারে। অর্থাৎ যে মানুষকে একটি প্রজাতির মশা বেশি আকর্ষণীয় মনে করে, অন্য প্রজাতির মশার কাছে তিনি একই মাত্রায় আকর্ষণীয় নাও হতে পারেন। এতে বোঝা যায়, “মশার কাছে আমি বেশি জনপ্রিয়”—বিষয়টি শুধু মানুষের শরীরের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে না; কোন প্রজাতির মশা সামনে আছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পৃথিবীর কোথায় মশা নেই?
এবার আসা যাক সবচেয়ে অদ্ভুত তথ্যটিতে। একসময় আইসল্যান্ডকে পৃথিবীর অন্যতম মশামুক্ত দেশ বলা হতো। দীর্ঘদিন সেখানে মশার স্থায়ী বংশবিস্তার দেখা যায়নি। দেশটির ঠান্ডা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু সেই গল্প বদলে গেছে।
২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর, রাজধানী রেইকিয়াভিকের উত্তরে কিয়োস এলাকায় তিনটি মশা পাওয়া যায়। পরে আইসল্যান্ডের ন্যাচারাল হিস্ট্রি ইনস্টিটিউট সেগুলো পরীক্ষা করে নিশ্চিত করে যে এগুলো সত্যিই মশা। মশাগুলোকে Culiseta annulata প্রজাতির বলে শনাক্ত করা হয়—যা তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা সহ্য করতে পারে।
ফলে বহুদিনের “মশাবিহীন আইসল্যান্ড” পরিচয়ের অবসান ঘটে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে আইসল্যান্ড এখন মশায় ভরে গেছে। বরং প্রশ্ন হলো—এই প্রজাতি সেখানে স্থায়ীভাবে বংশবিস্তার করতে পারবে কি না, সেটিই বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আইসল্যান্ডের এই পরিবর্তনের পর অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর একমাত্র বড় অঞ্চল হিসেবে মশামুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। এর কারণ খুব সহজ—অ্যান্টার্কটিকার চরম ঠান্ডা ও প্রতিকূল পরিবেশ মশার স্বাভাবিক জীবনচক্র সম্পন্ন করার জন্য অত্যন্ত কঠিন। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে পৃথিবীর প্রতিটি ছোট দ্বীপ বা বিচ্ছিন্ন এলাকায় মশা থাকবেই। স্থানীয়ভাবে মশার প্রজাতি নির্মূল বা অনুপস্থিত থাকতে পারে। তবে পুরো একটি বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে অ্যান্টার্কটিকা এখন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
মশার গুরুত্ব শুধু কামড়ের অস্বস্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। আক্রান্ত মশার কামড়ে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ওয়েস্ট নাইল জ্বরসহ বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মশাবাহিত রোগ উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলে বেশি দেখা গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাতিশীতোষ্ণ এলাকাতেও এসব রোগের বিস্তার ঘটছে। ডেঙ্গু বিশেষ করে Aedes aegypti মশার মাধ্যমে ছড়ায়। WHO-এর হিসাবে, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা কয়েক কোটি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
একই ঘরে বসে থাকা দুজন মানুষের একজনকে যদি মশা বেশি কামড়ায়, তার মানে এই নয় যে মশা তাকে ‘বেশি ভালোবাসে’। বরং তার শরীর থেকে বের হওয়া CO₂, তাপ, আর্দ্রতা ও বিশেষ ধরনের গন্ধের রাসায়নিক মিশ্রণ মশার কাছে তুলনামূলক বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।
আর পৃথিবীতে এমন একটি জায়গাও রয়েছে, যেখানে এই বিরক্তিকর পতঙ্গের উপস্থিতিই নেই—অ্যান্টার্কটিকা।
আর একসময় সেই তালিকায় থাকা আইসল্যান্ডের গল্পটিও এখন বদলে গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেখানে প্রথমবারের মতো মশা শনাক্ত হওয়ার ঘটনা বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে—উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবী কি মশার জন্য নতুন নতুন জায়গার দরজা খুলে দিচ্ছে?
তথ্যসূত্র: National Institutes of Health (NIH),Scientific Reports / Nature, Rockefeller University গবেষণা — ত্বকের কার্বক্সিলিক অ্যাসিড ও মশার আকর্ষণ, Icelandic Institute of Natural History / RÚV, World Health Organization (WHO), Science News.
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ভিন্ন স্বাদের খবর এর সর্বশেষ খবর