সন্ধ্যা নামলেই কুতুপালংয়ের একটি ক্যাম্পে আতঙ্ক নেমে আসে। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দেন বাসিন্দারা। শিশুরা বাইরে খেলতে যায় না। পুরুষদের কেউ কেউ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হন না। কারণ, অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পের পাহাড়ি পথগুলোতে সক্রিয় হয়ে ওঠে সশস্ত্র দলগুলোর চলাচল।
কয়েক বছর আগেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রধান উদ্বেগ ছিল খাদ্য, আশ্রয় ও প্রত্যাবাসন। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরেক ভয়ংকর বাস্তবতা; নিজেদের মধ্যেই সশস্ত্র অপরাধী চক্রের দাপট।
খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ, মানব পাচার, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, স্বর্ণ পাচারসহ নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্যাম্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পে প্রায়ই গোলাগুলি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চার হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা।
অপরাধের এই বিস্তার শুধু ক্যাম্পের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি এলাকা, ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদ এবং সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পথও এসব অপরাধী চক্রের তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাড়ে চার হাজারের মতো মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা।
এর মধ্যে ২৮৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা ২৭৭ মামলায় আসামি হয়েছেন দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। মাদকের সাড়ে তিন হাজার মামলায় আসামি ৫ হাজার ৯৩৫ জন। অস্ত্র ও দস্যুতার ১৬৫ মামলায় ৩১২ জন, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ৩৫২ মামলায় ৫২১ জন, অপহরণের ৩০৬ মামলায় ৩৫৩ জন এবং মানব পাচারের চার শতাধিক মামলায় ৮৭৯ জন আসামি হয়েছেন। এর বাইরে অন্যান্য আইনে আরও শতাধিক মামলা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ক্যাম্পে অপরাধের ধরন যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যাও।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমিন বলেন, ‘খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মানব পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, ইয়াবা ও স্বর্ণ চোরকারবারসহ আরও কয়েক ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ক্যাম্পে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।’
ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধের সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বিস্তার নতুন নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসন আটকে থাকা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়া, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং ক্যাম্পজীবনের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র। মাদক ও অস্ত্রের চালান, সীমান্তপথে মানব পাচার কিংবা মুক্তিপণের জন্য অপহরণের মতো অপরাধে ক্যাম্পের ভেতর থেকে লোক সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ক্যাম্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ছোট-বড় একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এসব দলের মধ্যে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব থেকেই কখনো প্রকাশ্যে গোলাগুলি, কখনো টার্গেট করে হত্যা, আবার কখনো অপহরণের ঘটনা ঘটছে।
টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আলী বলেন, ক্যাম্পে এখনো এক ডজনের বেশি অপরাধী চক্র সক্রিয়। তাদের বেশির ভাগই সশস্ত্র। তার মতে, এসব অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার করা জরুরি।
অপরাধের শিকার শুধু স্থানীয় বাংলাদেশিরা নন। ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারাও নিজেদের মধ্যে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভয়ে অনেকটা জিম্মি হয়ে আছেন।
উখিয়ার কুতুপালং ৫ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা আয়েশা বেগমের স্বামী কোনো অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। রাতে পাহারার কাজ করতেন। কিন্তু এক রাতে মুখোশধারীদের একটি দল তাকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ আয়েশা। চার সন্তান নিয়ে এখন তার দিন কাটে আতঙ্কে।
আয়েশা বলেন, ‘আমার স্বামী কোনো দল করতেন না, শুধু রাতে পাহারার কাজ করতেন। মাঝরাতে একদল মুখোশধারী এসে তাকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায় এবং গুলি করে মেরে ফেলে। এখন আমি চার সন্তান নিয়ে চরম আতঙ্কে আছি। ক্যাম্পে অন্ধকার নামলেই আমাদের বুক কাঁপে, কখন কার ঘরে হামলা হয় কেউ জানে না।’
বালুখালী ক্যাম্পের মাঝি মোহাম্মদ জুবায়েরের অভিজ্ঞতাও একই রকম। অপরাধীদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিতে চাইলেও প্রতিশোধের ভয় রয়েছে বলে জানান তিনি।
জুবায়ের বলেন, ‘আমরা পুলিশকে অপরাধীদের তথ্য দিতে চাই, কিন্তু তথ্য দিলেই আমাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে। সশস্ত্র গ্রুপগুলো সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকে। পুলিশ এলে তারা পাহাড়ে পালায়, পুলিশ চলে গেলে আবার এসে হুমকি দেয়। এখানে সাধারণ রোহিঙ্গারা অপরাধীদের কাছে জিম্মি।’
ক্যাম্পের ভেতরের সহিংসতার প্রভাব পড়ছে আশপাশের বাংলাদেশি জনপদেও।
টেকনাফের লেদা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যার পর ওই এলাকার সড়কে চলাচল করতেই ভয় লাগে।
তার ভাষ্য, ‘রাত ৮টার পর এই সড়ক দিয়ে একা চলাফেরা করা যায় না। যেকোনো সময় অপহরণের শিকার হতে হয়। গত মাসেও আমাদের এক প্রতিবেশীকে পাহাড়ের ভেতর তুলে নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। আমরা নিজেদের এলাকায় এখন পরবাসী।’
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিনের বসতবাড়ি কুতুপালং ক্যাম্পের কাছেই। তার অভিযোগ, ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় অপরাধ বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমবাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পের সঙ্গে লাগোয়া এলাকায় নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি তারা স্থানীয়দের শ্রমবাজার দখল করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।’
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এরপর কেটে গেছে প্রায় নয় বছর। দুই দফা প্রত্যাবাসনের দিনক্ষণ ঠিক হলেও শেষ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
বরং গত দেড় বছরে নতুন করে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। একই সময়ে ক্যাম্পগুলোতে জন্ম নিয়েছে বিপুলসংখ্যক শিশু। অর্থাৎ প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা জনগোষ্ঠীর আকার কমেনি, বরং বেড়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আন্তর্জাতিক সহায়তাও আগের তুলনায় কমেছে। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও জীবিকার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সংকট তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে অপরাধী চক্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমানের দাবি, ক্যাম্পের বাইরে জেলার বিভিন্ন অপরাধেও রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে তাঁর এই দাবির পক্ষে স্বাধীন কোনো পরিসংখ্যান তিনি দেননি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ ও সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর।
বাংলাদেশে সংস্থাটির প্রধান ইভো ফ্রেজেনের মতে, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও মানবিক সহায়তার ঘাটতি এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্যাম্পজীবন অপরাধ ও সহিংসতার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা যাবে না বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য ক্যাম্পের ভেতরে উৎপাদনশীল ও আত্মনির্ভরশীল কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। কারণ, দীর্ঘদিন কোনো কাজের সুযোগ না থাকা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা অপরাধী চক্রের জন্য তরুণদের টার্গেট করার সুযোগ তৈরি করছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘদিন প্রত্যাবাসন ঝুলে থাকায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। এই হতাশাকে কাজে লাগাচ্ছে অপরাধী চক্র।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ নয় বছর ধরে প্রত্যাবাসন ঝুলে থাকায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। এই হতাশাকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অপরাধী চক্র তাদের মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।’
ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদারে কাঁটাতারের বেষ্টনী ও সিসি ক্যামেরার আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ ক্যাম্পগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমিন বলেন, ক্যাম্পগুলো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং পাহাড়ঘেরা। একটি ব্লক থেকে অন্য ব্লকে কিংবা পাহাড়ে পালিয়ে গেলে অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘আমরা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াচ্ছি এবং নিয়মিত বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করছি। শিগগিরই যেকোনো অপরাধ নির্মূল করা হবে।’
এফডিএমএনে পুলিশের ডিআইজি মিয়া মাসুদ করিমও ক্যাম্পের ভৌগোলিক বাস্তবতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা ৩৩টি ক্যাম্পে বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে অপরাধীদের আলাদা করে চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তার দাবি, ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধের বিস্তারকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে সংকটের পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, তরুণদের ভবিষ্যৎহীনতা এবং ক্যাম্পের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব। অপরাধ দমনে অভিযান ও অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি এই কারণগুলো মোকাবিলাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ, নয় বছর ধরে ক্যাম্পে আটকে থাকা একটি জনগোষ্ঠীর সামনে যদি ভবিষ্যতের কোনো স্পষ্ট পথ না থাকে, তাহলে হতাশা ও অনিশ্চয়তার সুযোগ নেবে অপরাধী চক্রই।
আজ ক্যাম্পে যে আতঙ্ক, তা শুধু রোহিঙ্গাদের নয়। এর ছায়া পড়ছে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনপদেও। এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর