জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাবে কিছুটা কাটছাঁট করে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। সচিব কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ‘জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬’-এ আগের মতোই ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। তবে কমিশনের প্রস্তাবের তুলনায় ১ম, ৮ম ও ৯ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতনে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
গত সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬’ অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। তবে বর্ধিত বেতনের আর্থিক সুবিধা একবারে দেওয়া হবে না। তিন ধাপে মূল বেতন সমন্বয় করা হবে।
প্রথম ধাপে মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর করা হবে। পরবর্তী দুই ধাপে বাকি অংশ সমন্বয় করা হবে। আর বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের ব্যবধান কমেছে
জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫-এর প্রস্তাব পর্যালোচনার সময় মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয় সচিব কমিটি। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতনের ব্যবধানও পর্যালোচনা করা হয়।
বিদ্যমান বেতন কাঠামোয় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতনের অনুপাত ছিল ১:৯ দশমিক ৪৫। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ১:৭ দশমিক ৮ করা হয়েছে।
যেসব গ্রেডে পরিবর্তন
সচিব কমিটির সুপারিশে কমিশনের প্রস্তাবিত ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। প্রতিটি গ্রেডে প্রস্তাবিত ধাপ সংখ্যাও অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা রাখার প্রস্তাবও বহাল রাখা হয়েছে।
তবে ১ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। জাতীয় বেতন কমিশন এ গ্রেডে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেছিল। সচিব কমিটি তা কমিয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে। শেষ পর্যন্ত নতুন বেতন কাঠামোয় ১ম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
৮ম ও ৯ম গ্রেডেও কমিশনের প্রস্তাবের তুলনায় বেতন বৃদ্ধির হার কমানো হয়েছে। এই দুই গ্রেডে কমিশন প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। সচিব কমিটি তা কমিয়ে ১০০ শতাংশ করার সুপারিশ করে। অন্য গ্রেডগুলোতে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার বহাল রাখা হয়েছে।
ফলে নতুন স্কেলে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আর সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে।
২০ গ্রেডে নতুন বেতন কাঠামো
নতুন বেতন কাঠামোয় ১ম গ্রেডে মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২য় গ্রেডে ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা এবং ৩য় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা করা হয়েছে।
৪র্থ গ্রেডে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা এবং ৫ম গ্রেডে ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৬ষ্ঠ গ্রেডে ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা এবং ৭ম গ্রেডে ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা করা হয়েছে।
৮ম গ্রেডে মূল বেতন ৪৬ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ৪০০ টাকা এবং ৯ম গ্রেডে ৪৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৬০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১০ম গ্রেডে ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং ১১তম গ্রেডে ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে।
১২তম গ্রেডে ২৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা এবং ১৩তম গ্রেডে ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৪তম গ্রেডে ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১৫তম গ্রেডে ২২ হাজার ৮০০ থেকে ৫৫ হাজার ২০০ টাকা করা হয়েছে।
১৬তম গ্রেডে ২১ হাজার ৯০০ থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা এবং ১৭তম গ্রেডে ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৮তম গ্রেডে ২১ হাজার থেকে ৫০ হাজার ৯০০ টাকা এবং ১৯তম গ্রেডে ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা করা হয়েছে।
সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ২০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি
নতুন স্কেলে ১ম থেকে ১১তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ রাখা হয়েছে। ১২তম গ্রেডে এ হার ১১৫ শতাংশ, ১৩তম গ্রেডে ১১৮ শতাংশ এবং ১৪তম গ্রেডে ১৩০ শতাংশ।
এ ছাড়া ১৫তম ও ১৬তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ১৩৫ শতাংশ, ১৭তম গ্রেডে ১৩৮ শতাংশ এবং ১৮তম গ্রেডে ১৩৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ১৯তম গ্রেডে এ হার ১৪১ শতাংশ এবং ২০তম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ রাখা হয়েছে।
বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার
নতুন কাঠামোয় জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫-এর প্রস্তাব অনুযায়ী বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হারও বহাল রাখা হয়েছে।
২য় গ্রেডে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ৩য় ও ৪র্থ গ্রেডে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ৫ম গ্রেডে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নতুন বেতন কাঠামোয় ২০টি গ্রেড বহাল থাকলেও কয়েকটি গ্রেডে কমিশনের প্রস্তাবের তুলনায় সামান্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির হার ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত হওয়ায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ছে। অন্যদিকে, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতনের ব্যবধানও আগের তুলনায় কমানো হয়েছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর