বলেশ্বর নদে ভেসে উঠল বিশাল কুমির, স্থানীয় মৎস্যজীবীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক এনায়েত করিম মোরেলগঞ্জ প্রতিনিধিঃ সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর নদে ১২ থেকে ১৩ ফুট দীর্ঘ একটি বিশাল আকৃতির কুমিরের দেখা মিলেছে। এতে নদ পাড়ের বাসিন্দা ও জেলেরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর দুইটার দিকে সুন্দরবন সংলগ্ন সাউথখালী ইউনিয়নের বাবলাতলা ও গাবতলা এলাকায় বলেশ্বর নদে হঠাৎ করেই একটি বিশাল আকৃতির কুমিরের বিচরণ লক্ষ করেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
সুন্দরবনের অত্যন্ত কাছাকাছি প্রবাহিত এই নদিটিতে এর আগে কখনো এ ধরনের বন্য প্রাণীর উন্মুক্ত চলাচল দেখা যায়নি, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে নদীর পাড়ে শত শত উৎসুক জনতা ভিড় জমায়। কে বা কারা প্রথম কুমিরটিকে পানির ওপরে ভেসে উঠতে দেখে, সেই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই পুরো এলাক জুড়ে এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। মূলত প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র বা খাদ্যের অন্বেষণে বনের সীমানা পেরিয়ে বন্য প্রাণীটির লোকালয় সংলগ্ন নদটিতে চলে আসার এই আকস্মিক ঘটনাটি পুরো অঞ্চলের জনজীবনকে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ১২ থেকে ১৩ ফুট দৈর্ঘ্যের কুমিরটির আকৃতি এতটাই বড় ছিল যে, নদীর পানিতে এর উপস্থিতি টের পাওয়ার পরই স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সবাই তাৎক্ষণিকভাবে নদী থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যান। এই আকস্মিক বন্য প্রাণী বিচরণের ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বলেশ্বর নদ পাড়ের স্থায়ী বাসিন্দা এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য নদীর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল মৎস্যজীবীরা। শরণখোলা উপকূলের এই জনপদের বহু মানুষের একমাত্র আয়ের উৎস নদে জাল ফেলে মাছ শিকার করা, অথচ এই বিশাল কুমিরের উপস্থিতি তাদের দৈনন্দিন কাজকে পুরোপুরি থমকে দিয়েছে।
ভুক্তভোগী জেলে ও নদ পারের মানুষেরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই এই বন্য প্রাণী লোকালয়ের এত কাছে চলে আসায় তারা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জীবন ও জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে নদীতে নামতে বাধ্য হওয়া এসব সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেছেন যে, নদীর পানিতে নেমে জাল টানা কিংবা দৈনন্দিন গোসল ও অন্যান্য কাজের জন্য পানি ব্যবহার করা এখন তাদের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের এই দীর্ঘস্থায়ী ভীতি এবং কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক গভীর ছায়া ফেলেছে, যা তাদের সাধারণ চলাফেরাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের স্টেশন কর্মকর্তা মোড খলিলুর রহমান গণমাধ্যমের কাছে বন্য প্রাণীটির চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং এর প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের আলীবান্দা ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র এলাকার বাইরে এই আকৃতির কুমির প্রায়ই বিচরণ করে থাকে এবং সেখান থেকে মাঝেমধ্যে রেঞ্জ অফিসের সামনের শরণখোলা ও বগী ভাড়ানি এলাকা হয়ে তেড়াবেকা পর্যন্ত এসে পুনরায় বনের সীমানায় ফিরে যায়।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বলেশ্বর নদ সুন্দরবনের নিকটবর্তী হওয়ায় বন্য প্রাণীর এই ধরনের আকস্মিক বিচরণ সম্পূর্ণ অসম্ভব কিছু নয় এবং সম্ভবত কোনো প্রাকৃতিক কারণে এটি লোকালয় ঘেঁষা নদীতে চলে এসেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে বন বিভাগ থেকে ইতিমধ্যে মাইকিং ও মৌখিক বার্তার মাধ্যমে নদ পাড়ের মৎস্যজীবীদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মাছ শিকার করতে এবং নদীতে নেমে গোসল করা থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে, বগী ফরেস্ট স্টেশন অফিসের বনরক্ষীদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে বলা হয়েছে যাতে কুমিরটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। বলেশ্বর নদের বুকে এই বিশাল আকৃতির কুমিরের নিয়মিত বা সাময়িক উপস্থিতি কেবল সাময়িক আতঙ্কই তৈরি করেনি, বরং এটি মানুষ ও বন্য প্রাণীর সহাবস্থানের সংকটকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। সুন্দরবনের সংলগ্ন জনপদগুলোতে বন্য প্রাণীর লোকালয়মুখী হওয়ার এই প্রবণতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা ভবিষ্যতে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাময়িক সতর্কতা জারি করা হলেও, নদ তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও স্থায়ী ও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বন্য প্রাণীর নিরাপদ চলাফেরা এবং সাধারণ মানুষের জানমালের সুরক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় না রাখলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি এবং জনজীবন আরও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর