যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে পারস্য উপসাগরের তলদেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও ইন্টারনেট কেবলগুলোতে আঘাত হানার পরিকল্পনা করেছে ইরান। শুধু কেবল বিচ্ছিন্ন করাই নয়, হামলার পর সেগুলো মেরামতের কাজও বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তেহরানের। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইন্টারনেট, আর্থিক লেনদেন ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে এবং নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে এসব কেবল ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আবার হামলা চালালে দেশটির পাল্টা জবাবের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল থেকে শুরু করে গোপন সামরিক স্থাপনা পর্যন্ত বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পরিকল্পনা রয়েছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, ইরান আক্রান্ত হলে আর কোনো ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা থাকবে না। ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে তিনি বলেন, আগুন নিয়ে খেলা বন্ধ করা উচিত। তাঁর দাবি, সমুদ্রতলের এসব কেবলে আঘাত হানার সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে। হামলার পর যাতে দ্রুত মেরামত করা না যায়, সে ব্যবস্থাও নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কর্মকর্তারা সম্ভাব্য হামলার সুনির্দিষ্ট স্থান বা পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি।
এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক বিষয়ক উপপ্রধান ইয়াদুল্লাহ জাভানি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরানের অবকাঠামোতে হামলা হলে হরমুজ প্রণালির তলদেশে থাকা সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট কেবলকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ অঞ্চলের সমুদ্রতলের কেবলগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে ইরানের বক্তব্যকে এখনই বাস্তব হামলার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে তেহরানের কর্মকর্তাদের দেওয়া হুঁশিয়ারি।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগ সমুদ্রতলের কেবলনির্ভর। এসব ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিপুল পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান করা হয়। তবে টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির গবেষণা পরিচালক অ্যালান মলদিনের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের এক শতাংশেরও কম প্রবাহিত হয়। ফলে এ অঞ্চলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট যোগাযোগে বড় ধরনের বিপর্যয় নাও ঘটতে পারে।
তবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে এর প্রভাব গুরুতর হতে পারে। একাধিক কেবল বিচ্ছিন্ন হলে ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া, আর্থিক লেনদেনে বিঘ্ন, ই-কমার্স কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং ক্লাউড কম্পিউটিং সেবায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে বিকল্প যোগাযোগপথের সক্ষমতা এবং ইন্টারনেট ট্রাফিক অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগের ওপর।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তেলনির্ভর অর্থনীতির বাইরে প্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। এসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিভিন্ন মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি দেশটির আঞ্চলিক মিত্র ও মার্কিন বিনিয়োগকারীদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে নতুন সামরিক অভিযান থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হতে পারে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রযুক্তি অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার ও এআই প্রকল্পগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলো মেরামত করতে বিশেষায়িত জাহাজ ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সমুদ্রসীমায় প্রবেশের অনুমতি, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং বর্ধিত বীমা ব্যয়ের কারণে মেরামতকাজ দীর্ঘায়িত হতে পারে। ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার পর মেরামত বাধাগ্রস্ত করার বিষয়টিও তাদের পরিকল্পনার অংশ। বাস্তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে বিকল্প যোগাযোগপথের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হতে পারে।
তবে বিকল্প স্থলভিত্তিক যোগাযোগপথ এবং নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, ইরানের এই হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি সমুদ্রতলের ডিজিটাল অবকাঠামোও সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকিতে চলে আসায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর