টুপটুপ রিসোর্টের সর্বনাশা আগুনে পুড়ে আগেই ‘কয়লা’ হয়ে গিয়েছিল ১০ পর্যটক। এদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। পুড়ে যাওয়া স্বজনদের চিনতে না পারায় তাদের ডিএনএ স্যাম্পল পাঠাতে হয়েছিল ল্যাবে। আর সেই রিপোর্টের আশায় অঙ্গার হওয়া মরদেহ গুলো পড়েছিল মর্গের হিমশীতল ঘরে। আর সবাই অপেক্ষায় ছিলেন- কখন আসবে ‘ডিএনএ রিপোর্ট’। গুণে গুণে নয়দিন পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ল্যাব থেকে খবর এলো- দশজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও একজনের খোঁজ মিলছে না। তিনি হলেন নাসরিন আক্তার মুক্তা।
সাভারের আশুলিয়া নিরিবিলি স্কুলের এই শিক্ষিকার বাবা মো. মোস্তফা কামালও অন্যদের মতো মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করার জন্য নিজের ডিএনএ স্যাম্পল দিয়েছিলেন। কিন্তু শনাক্ত হওয়া ১০টি মরদেহের একটির সাথেও মিলছে না তাঁর ডিএনএ। মানে দাঁড়ায়, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে থাকা ১০টি মরদেহের মাঝে মুক্তার মরদেহ নেই।
দ্রুত সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। সোমবারের (২৬ অক্টোবর) রাত পেরিয়ে সকাল হতেই উখিয়া থানা পুলিশ আবারও নেমে পড়ে আরেকটি লাশের খোঁজে।
ইনানীর পাটুয়ারটেকের সেই অভিশপ্ত ‘টুকটুক রেস্টো ও রিসোর্টে’র ধবংসস্তুপে শুরু হয় তল্লাশি। কয়েকঘন্টার চেষ্টার পর অত্যন্ত ঝুঁকিতে থাকা রিসোর্টের ধ্বংসস্তুপে মিলে একটি মরদেহ। ১০ দিনের পঁচে যাওয়া শরীরে কেবল কঙ্কালটাই পড়ে আছে। আর নিখোঁজ মুক্তার স্বামী ফয়সাল দেওয়ান ‘কঙ্কাল শরীরের গলা’য় লকেট দেখে চিনতে পারেন- ইনিই তার জীবনসঙ্গী নাসরিন আক্তার মুক্তা। যে লকেটটি তিনিই স্ত্রীকে কিনে দিয়েছিলেন।
আর এই মরদেহ উদ্ধারের মধ্যদিয়ে টুকটুক রিসোর্ট ট্র্যাজেডিতে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ জনে। এদের মধ্যে দুইজন পুরুষ, দুইটি শিশু ও ৭ জন নারী। এদের মধ্যে আবার তিনজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, সোমবার রাতে আনঅফিসিয়ালি ডিএনএ রিপোর্টে একজনের মিসিং থাকার খবর পেয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকেই পুলিশ আবারও তল্লাশি করে। রিসোর্টের সম্ভাব্য সব জায়গা ও আশপাশের নালা ও ঝোঁপঝাড়েও তল্লাশি করা হয়। যদিও আগেও তন্নতন্ন করে খোঁজ করা হয়েছিল, কিন্তু পুড়ে যাওয়া রিসোর্টে আগুনের তাপের কারণে একটি মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, মরদেহ উদ্ধার হলেও ১০ দিন পার হওয়ায় অনেকটা কঙ্গাল সশৃস্য দেহ পাওয়া গেছে। তার স্বামী ফয়সাল দেওয়ান গলার লকেট দেখে স্ত্রীর মরদেহ শনাক্ত করেছেন।
নাসরিন আক্তার মুক্তা তাঁর দুই বান্ধবীর সাথে কক্সবাজার বেড়াতে এসে শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের ইনানীর পাটুয়ারটেকে মেরিন ড্রাইভ লাগোয়া টুপটুপ রেষ্টো ও রিসোর্টে উঠেছিলেন। ওই রিসোর্ট ১৭ অক্টোবর সকালে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পুড়ে যাওয়ার পর ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হলেও মুক্তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সুত্রমতে, নাসরিন আক্তার গাজীপুরের সাভার থেকে দুই বান্ধবীর সাথে কক্সবাজার এসেছিলেন। অগ্নিকান্ডের দিন ভোরে অন্য দুই বান্ধবী বিচে হাঁটাহাঁটি করার জন্য বের হলেও রিসোর্টের রুমে ঘুমিয়ে ছিলেন মুক্তা। ওই বান্ধবীরা বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে গেলেও স্কুলশিক্ষিকা মুক্তা বাঁচতে পারেননি।
ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত ১০ মরদেহ সুত্রমতে, ডিএনএ পরীক্ষার পর শনাক্ত হওয়া ১০ জনের মরদেহ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরের পর স্বজনদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহ গুলো নিকটাত্মীয়দের হাতে তুলে দেয়া হয়। এদের মধ্যে ঢাকার দুটি পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন। তাদের একটি পরিবারের চারজন এবং অন্য পরিবারের ছয়জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হয়।
এরা হলেন চার সদস্যের পরিবারটির মধ্যে শ্যামলীতে অবস্থিত গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬), অন্য পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), তার কাজিন লায়লা জাহান নাবিলা (২৫) ও ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)। তারা ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন।
নাফিস তেহামি ‘জেরিফ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
অপরদিকে মৌলিতা মেহজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে পপুলেশন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সায়েন্সেস বিষয়ে পড়াশোনা করতেন। লায়লা জাহান নাবিলা ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) পুড়ে যাওয়া মরদেহগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা করে এবং স্বজনদের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করেছে।
যেভাবে পরিচয় শনাক্ত কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল সুত্র জানিয়েছে, মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১) এবং তার দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানার (৬) পরিচয় শনাক্তের জন্য নাহিদুর রহমানের বাবা মো. মতিয়ার রহমান এবং স্ত্রী আফসানা মতিনের (৩৬) জন্য তার বাবা আবদুল মতিন ও মা রেহানা আফরোজ ডিএনএ স্যাম্পল দিয়েছিলেন।
অপরদিকে মৌলিতা মেহজাবিন আলভির (১৯) জন্য তার বাবা মো. সেলিম, লায়লা জাহান নাবিলা (২৫) ও ইসরাত জাহান মালিহার (২৭) জন্য তাদের বাবা মোঃ মামুনউর রশীদ, ফারিয়া কবিরের (৩৩) জন্য তার বাবা মোঃ জেয়াদুল কবির, ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূরের জন্য তার বাবা মোঃ নুর আলম এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামির (২৪) জন্য তার বাবা মোঃ জেয়াদুল কবির ডিএনএ স্যাম্পল দেন।
এছাড়াও নাসরিন আক্তার মুক্তার জন্য তার বাবা মো. মোস্তফা কামাল ডিএনএ স্যাম্পল দিয়েছিলেন।
মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা, উখিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ জানান, ১১ জনের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ স্যাম্পল পাওয়া গিয়েছিল। ল্যাবে পরীক্ষার পর ডিএনএ স্যাম্পলের সাথে হিমঘরে থাকা ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তবে মুক্তার বাবা মোস্তফা কামালের ডিএনএ স্যাম্পল কারো সাথে মিলেনি।
এদিকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গের হিমঘর থেকে ১০টি মরদেহ স্বজনদের হাতে তুলে দেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নান ও পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান।
প্রসঙ্গত, নাসরিন আক্তার মুক্তা ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারের আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। তার স্বামী ফয়সাল দেওয়ান ঢাকা জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ছিলেন। তিনি স্ত্রীর মরদেহ পেতে ১০ দিন ধরে কক্সবাজার ও ঢাকায় ঘুরছেন।
তিনি বলেন, ১০ দিন পর লাশ পেলে তার কী অবস্থা থাকে বুঝেন। যেভাবেই হোক আমার স্ত্রীর বডিটি চেয়েছিলাম।
দেওয়ান ফয়সাল দাবি করেন, শুধুমাত্র রিসোর্ট মালিকদের গাফেলতির কারণে এত গুলো মৃত্যু হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তুলেন, অগ্নিকান্ডের পর রিসোর্ট মালিক বেরিয়ে যেতে পারলেন! তার পোষা দুইটি কুকুর ও কয়েকটি বিড়াল বের করে নিয়ে যেতে পারলো! রিসোর্ট ও রেষ্টুরেন্টের কর্মচারিরা বের হয়ে গেলেন! কিন্তু ১১ জন মানুষকে বের করতে পারলেন না।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর