বাংলাদেশ ক্রিকেটে প্রতিভার অভাব নেই। প্রয়োজন সেই প্রতিভাকে সঠিক পরিচর্যা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে বিকশিত করা। বাংলাদেশের বর্তমান ক্রিকেটারদের নিয়ে এমনই আশাবাদী মন্তব্য করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক পেসার ও খ্যাতিমান ধারাভাষ্যকার ইয়ন বিশপ। লিটন দাসের ব্যাটিং, হাসান মাহমুদের বোলিং এবং তরুণ পেসার নাহিদ রানার দুর্দান্ত গতি নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন তিনি।
বিশপের চোখে, লিটন দাসের সামনে বিশ্বমানের ব্যাটার হয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। হাসান মাহমুদ হতে পারেন বাংলাদেশের পেস আক্রমণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অস্ত্র। আর নাহিদ রানার সহজাত গতি তাঁকে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম আকর্ষণীয় পেসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
তবে নাহিদকে নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি সতর্কও করেছেন এই ক্যারিবীয় কিংবদন্তি। তাঁর মতে, তরুণ এই পেসারের প্রতিভার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে ফিটনেস, কন্ডিশনিং ও চোট ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
লিটন দাসের ব্যাটিং প্রতিভা নিয়ে ইয়ন বিশপের মুগ্ধতা নতুন নয়। ২০১৯ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে লিটনের দৃষ্টিনন্দন ইনিংসের প্রশংসা করে একসময় তাঁর ব্যাটিংকে মোনালিসার ছবির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এই ধারাভাষ্যকার।
লিটনের সামগ্রিক ক্যারিয়ার মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশপ মনে করেন, সাদা বলের ক্রিকেটে তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি প্রত্যাশা ছিল। তবে টেস্ট ক্রিকেটে লিটনের উন্নতি প্রশংসনীয়। ধারাবাহিকভাবে ভালো করার মাধ্যমে তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
বিশপের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লিটনের প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন নেই। এখন প্রয়োজন সেই প্রতিভাকে আরও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে রূপ দেওয়া। নিজের ব্যাটিংয়ের মান ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশের এই ব্যাটারের সামনে আরও বড় সাফল্যের সুযোগ রয়েছে।
একসময় বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ বলতে মূলত স্পিনারদের ওপর নির্ভরতার কথা বেশি আলোচিত হতো। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। তাসকিন আহমেদ, ইবাদত হোসেন, শরীফুল ইসলাম, হাসান মাহমুদ ও নাহিদ রানার মতো পেসারদের উপস্থিতি বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের এই অগ্রগতিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন বিশপ। বিশেষ করে হাসান মাহমুদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের প্রশংসা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, হাসান এমন একজন বোলার, যিনি ধারাবাহিকভাবে সঠিক লাইন ও লেংথ বজায় রেখে ব্যাটারদের চাপে রাখতে পারেন।
বাংলাদেশের পেসারদের স্লিপ ও গালিতে ফিল্ডার রেখে আক্রমণাত্মক বোলিং করার দৃশ্যও আশাব্যঞ্জক। বিশপের মতে, এ ধরনের বোলিংয়ের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া কিংবা অতীতের শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের পেস আক্রমণের পরিচিত বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়।
নাহিদ রানাকে নিয়ে বিশপের আগ্রহের মূল কারণ তাঁর সহজাত গতি। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি বা তার বেশি গতিতে বল করার সামর্থ্য একজন পেসারকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিশেষ সম্পদে পরিণত করে। এমন গতি অনুশীলনের মাধ্যমে কিছুটা উন্নত করা গেলেও সহজাতভাবে এই পর্যায়ের গতি পাওয়া বিরল।
বিশপের বক্তব্যের মূল সুর হলো, বিশ্বের প্রতিটি দলই নাহিদ রানার মতো দ্রুতগতির বোলার পেতে চাইবে। তাঁর প্রতিভা সঠিকভাবে বিকশিত হলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় তারকা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে এই তরুণের।
তবে শুধু গতি থাকলেই হবে না। দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে হলে শারীরিক সক্ষমতা, বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা এবং চোট থেকে সুরক্ষার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নাহিদ রানার প্রতিভা নিয়ে আশাবাদী হলেও তাঁর ফিটনেস ব্যবস্থাপনা নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশপ। তাঁর মতে, তাৎক্ষণিক সাফল্যের আশায় এই তরুণ পেসারকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া ঠিক হবে না।
নাহিদকে বাংলাদেশের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ হিসেবে বিবেচনা করে বিশপের সতর্কবার্তা—স্বল্পমেয়াদি সাফল্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না।
নাহিদের মতো দ্রুতগতির বোলারের ক্ষেত্রে আধুনিক ফিজিক্যাল ট্রেনিং, উপযুক্ত কন্ডিশনিং, পুনর্বাসন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। চোট থেকে ফেরার সময় তাড়াহুড়ো না করে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পর মাঠে ফেরানো উচিত। এতে একজন পেসারের ক্যারিয়ার দীর্ঘ হওয়ার পাশাপাশি দলের জন্যও তাঁর অবদান বাড়তে পারে।
বিশপের এই পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের ক্রিকেট ব্যবস্থাপনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিভাবান তরুণদের দ্রুত ফল পাওয়ার প্রত্যাশায় অতিরিক্ত ব্যবহার না করে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদী বিশপ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তরুণ ক্রিকেটারদের উঠে আসা এবং পেস আক্রমণের উন্নতি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অবস্থান ও ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা নির্ভর করে চলমান চক্রের পয়েন্ট, জয়ের হার এবং বাকি ম্যাচগুলোর ফলের ওপর। তাই বাংলাদেশের অবস্থান বা ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে কোনো দাবি প্রকাশের আগে হালনাগাদ পয়েন্ট তালিকা যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশের সাবেক তারকা ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশপ। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন খেলা কিংবদন্তিদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
মেন্টরিং, তরুণ ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষণ, কৌশলগত পরামর্শ এবং তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেটের উন্নয়নে তাঁদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশও নিজেদের ক্রিকেট কাঠামো আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিভা, বিশেষ করে পেস বোলিংয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন সেই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। আর নাহিদ রানার মতো দ্রুতগতির বোলারকে সঠিক পরিচর্যায় গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের ক্রিকেট লাভবান হবে—বিশপের বক্তব্যে উঠে এসেছে সেই প্রত্যাশাই।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
স্পোর্টস এর সর্বশেষ খবর