শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই আনন্দ, উৎসব আর জমজমাট খাওয়াদাওয়া। পূজার দিনগুলোতে খাবারের আয়োজনে একটু ভিন্নতা না থাকলে যেন উৎসবের আনন্দই পূর্ণতা পায় না। তাই এবারের পূজায় চিরচেনা মুরগির ঝোল কিংবা রোস্টের পরিবর্তে তৈরি করতে পারেন বেরেস্তা-কিশমিশের নবাবি চিকেন। বাদাম, কিশমিশ আর বেরেস্তার অপূর্ব মিশ্রণে তৈরি এই খাবার যেমন সুস্বাদু, তেমনি এর ঘ্রাণও মন মাতাবে।
পূজার উৎসবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বিশেষ কিছু খাওয়ার আনন্দই আলাদা। তবে বিশেষ খাবার মানেই যে রেস্তোরাঁয় যেতে হবে কিংবা রান্নাঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হবে, তা কিন্তু নয়। ঘরে থাকা কয়েকটি পরিচিত উপকরণ দিয়েই তৈরি করা যায় রাজকীয় স্বাদের খাবার।
এমনই একটি পদ বেরেস্তা-কিশমিশ চিকেন। মোগলাই রান্নার স্বাদ ও ঘ্রাণের অনুপ্রেরণায় তৈরি এই পদে রয়েছে মিষ্টি ও ঝালের চমৎকার সমন্বয়। বেরেস্তার মিষ্টি ঘ্রাণ, কিশমিশের হালকা মিষ্টতা এবং কাঠবাদামের মোলায়েম স্বাদ মুরগির মাংসকে করে তোলে অনন্য।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই রান্নায় আলাদা করে পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। টক দই, মাংসের নিজস্ব রস এবং মসলার সংমিশ্রণে তৈরি হয় ঘন ও সুস্বাদু গ্রেভি। পোলাও, পরোটা কিংবা ফ্রায়েড রাইসের সঙ্গে পরিবেশন করলে পূজার ভোজ হয়ে উঠবে আরও আকর্ষণীয়।
চলুন, জেনে নেওয়া যাক কীভাবে ঘরেই তৈরি করবেন এই নবাবি চিকেন।
নবাবি চিকেন তৈরির উপকরণ
চার থেকে পাঁচজনের জন্য প্রয়োজন হবে—
- মুরগির মাংস — ১ কেজি
- টক দই — আধা কাপ
- সাদা তেল — পরিমাণমতো
- আদা-রসুন-কাঁচামরিচ বাটা — ২ টেবিল চামচ
- হলুদ গুঁড়া — ১ চা চামচ
- ধনেগুঁড়া — ১ টেবিল চামচ
- জিরাগুঁড়া — ১ টেবিল চামচ
- লাল মরিচের গুঁড়া — ১ টেবিল চামচ
- লবণ — স্বাদমতো
- চিনি — স্বাদমতো
- বেরেস্তা বা বাদামি করে ভাজা পেঁয়াজ — ১ কাপ
- খোসা ছাড়ানো কাঠবাদাম — ৬ থেকে ৮টি
- কিশমিশ — ১০ থেকে ১৫টি
যেভাবে তৈরি করবেন
প্রথম ধাপ: মাংস মেরিনেট করুন
প্রথমে মুরগির মাংস ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। এরপর একটি বড় পাত্রে মাংসের সঙ্গে টক দই, পরিমাণমতো লবণ এবং পেঁয়াজের বেরেস্তা ভাজার কিছুটা তেল মিশিয়ে নিন।
সব উপকরণ মাংসের সঙ্গে ভালোভাবে মেখে প্রায় দুই ঘণ্টা রেখে দিন। এতে মাংস নরম হবে এবং রান্নার সময় মসলার স্বাদ ভালোভাবে মিশবে।
দ্বিতীয় ধাপ: তৈরি করুন বিশেষ বাদাম-কিশমিশের মিশ্রণ
এবার একটি ব্লেন্ডারে এক কাপ বেরেস্তা, খোসা ছাড়ানো কাঠবাদাম ও কিশমিশ দিয়ে মিহি করে বেটে নিন। প্রয়োজন হলে সামান্য টক দই ব্যবহার করতে পারেন।
এই মিশ্রণই নবাবি চিকেনের স্বাদ ও ঘনত্বের অন্যতম প্রধান উপাদান। বেরেস্তার ঘ্রাণ, বাদামের মোলায়েম ভাব এবং কিশমিশের প্রাকৃতিক মিষ্টতা রান্নায় এনে দেবে বিশেষ স্বাদ।
তৃতীয় ধাপ: মসলা কষিয়ে নিন
চুলায় একটি কড়াই বসিয়ে পরিমাণমতো তেল গরম করুন। তেল গরম হলে আদা-রসুন-কাঁচামরিচ বাটা দিয়ে মাঝারি আঁচে কিছুক্ষণ কষিয়ে নিন।
এরপর একে একে হলুদ, ধনে, জিরা ও লাল মরিচের গুঁড়া যোগ করুন। সঙ্গে দিন পরিমাণমতো লবণ।
মসলাগুলো ভালোভাবে নেড়ে কষাতে থাকুন। মসলা থেকে তেল আলাদা হতে শুরু করলে বুঝবেন রান্নার পরবর্তী ধাপের জন্য এটি প্রস্তুত।
চতুর্থ ধাপ: মাংস রান্না করুন
এবার আগে থেকে মেরিনেট করে রাখা মুরগির মাংস কড়াইয়ে দিয়ে মসলার সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
মাঝারি আঁচে কয়েক মিনিট কষানোর পর ঢাকনা দিয়ে রান্না করুন। মাঝে মাঝে ঢাকনা খুলে নেড়ে দিন, যাতে মাংস কড়াইয়ের নিচে লেগে না যায়।
মাংস থেকে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা পানি বের হবে। সেই পানিতেই মাংস ধীরে ধীরে সেদ্ধ হতে থাকবে।
পঞ্চম ধাপ: যোগ করুন বেরেস্তা-কিশমিশের মিশ্রণ
মাংস আধা সেদ্ধ হয়ে এলে আগে তৈরি করে রাখা বেরেস্তা, কাঠবাদাম ও কিশমিশের মিশ্রণ কড়াইয়ে ঢেলে দিন। এরপর মাংসের সঙ্গে মিশ্রণটি ভালোভাবে কষিয়ে নিন। প্রয়োজন অনুযায়ী সামান্য চিনি যোগ করতে পারেন। তবে কিশমিশে প্রাকৃতিক মিষ্টতা থাকায় চিনি দেওয়ার আগে স্বাদ দেখে নেওয়াই ভালো।
এবার চুলার আঁচ একেবারে কমিয়ে ঢেকে রান্না করুন। মাংস সম্পূর্ণ সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
এই রান্নার বিশেষত্ব হলো, এতে সাধারণত বাড়তি পানি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে গ্রেভি অতিরিক্ত শুকিয়ে গেলে বা মাংস কড়াইয়ে লেগে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে অল্প গরম পানি দেওয়া যেতে পারে। মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে গ্রেভি ঘন হয়ে এলে চুলা বন্ধ করে দিন।
পরিবেশনায় আনুন রাজকীয় ছোঁয়া
রান্না শেষ হলে একটি সুন্দর পরিবেশন পাত্রে নবাবি চিকেন তুলে নিন। চাইলে ওপরে সামান্য বেরেস্তা, কয়েকটি কিশমিশ ও বাদাম ছড়িয়ে দিতে পারেন। এতে খাবারটি দেখতে আরও আকর্ষণীয় লাগবে। গরম পরোটা, বাসমতী চালের পোলাও কিংবা ফ্রায়েড রাইসের সঙ্গে এই চিকেন পরিবেশন করতে পারেন। বিশেষ করে মসলাদার ও ঘন গ্রেভির কারণে পরোটা কিংবা পোলাওয়ের সঙ্গে এর স্বাদ বেশ ভালো মানাবে।
রান্নার স্বাদ বাড়াতে কয়েকটি কৌশল
নবাবি চিকেন তৈরিতে বেরেস্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পেঁয়াজ ভাজার সময় খেয়াল রাখতে হবে, যেন তা পুড়ে না যায়। সোনালি-বাদামি রং হলেই তুলে নিতে হবে। অতিরিক্ত ভাজা পেঁয়াজ রান্নায় তেতো স্বাদ তৈরি করতে পারে। কিশমিশ ও কাঠবাদাম মিহি করে বাটলে গ্রেভি আরও মসৃণ হবে। অন্যদিকে টক দই মাংসকে নরম করার পাশাপাশি রান্নায় হালকা টক স্বাদ যোগ করবে, যা বাদাম ও কিশমিশের মিষ্টতার সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করবে। মাংস ভালোভাবে সেদ্ধ করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মুরগির ভেতরের অংশ সম্পূর্ণ সেদ্ধ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
উৎসবের আনন্দ শুধু নতুন পোশাক, মণ্ডপ দর্শন কিংবা আলোকসজ্জায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রিয়জনদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে ভালো খাবার উপভোগ করাও উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। আর সেই আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে ঘরে তৈরি বেরেস্তা-কিশমিশের নবাবি চিকেন। চিরাচরিত মুরগির রান্নার বাইরে একটু ভিন্ন স্বাদের খোঁজে থাকলে এবারের পূজায় পদটি তৈরি করে দেখতে পারেন। বাদামের মোলায়েম স্বাদ, কিশমিশের মিষ্টতা আর বেরেস্তার মনমাতানো ঘ্রাণে জমে উঠতে পারে আপনার উৎসবের ভোজ।
তাই এবারের পূজায় রেস্তোরাঁর খাবারের অপেক্ষা না করে নিজের রান্নাঘরেই তৈরি করুন নবাবি চিকেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপভোগ করুন ঘরোয়া আয়োজনে রাজকীয় স্বাদের এক বিশেষ পদ।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর